কেবল ছোটগল্পের পাঠকই বোধকরি এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, একটি গল্পপাঠ শেষে আরও অনেকগুলো গল্পের বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠেন। গল্পকারও খুব সচেতনতার সাথে এই কাজটি করে থাকেন। তবে গল্পে কি ঘটল কিংবা ঘটানো হলো তার সত্যমিথ্যা নির্ণয়যোগ্য কোন বিষয় নয়, তথাপি প্রশ্ন ওঠে; প্রশ্ন তোলেন সমালোচক। এই ক্ষণে রবিঠাকুরের বক্তব্যটুকু প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, ‘পোস্ট মাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকতো। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’ গল্পে বাস্তবতার প্রশ্নে আর এক জায়গায় রবিঠাকুর বলেছেন, 'আমার গল্পে বাস্তবের আভাব কখনও ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।' গল্পকার আইয়ুব আল আমিনের 'কামনা বাসনালয়' গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো পড়েও পাঠক এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন, যেমন, 'কামনা বাসনালয়' গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যে প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে তাকে সত্যমিথ্যায় নির্ণয় করা যাবে কিনা জানি না, কিন্তু পাঠক স্বাধীনতার চেতনায় পুনরুজ্জীবিত হবেন। ইতিহাস নির্ভর গল্পগুলোই এমন, যেটা পঠক হুমায়ূন আহমেদের ইতিহাস নির্ভর ছোটগল্পেও লক্ষ করে থাকবেন। কেননা ইতিহাসের পুনর্লেখন গল্পকারের কাজ নয়, ইতিহাসের নতুন সম্ভাবনাকে খুলে দেখানোই গল্প। এই গল্পে--- গল্পকথক কেবল একটিমাত্র চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে গল্পটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন, সে কামালউদ্দিন, কথকের বয়ানে জানতে পারি তার মা মরা মেয়েটি এবং বৃদ্ধ পিতাকে সে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে চিন্তিত। নিজে মুক্তিযুদ্ধে যেতে চেয়েও কোন কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বাকি যে চরিত্র গল্পের বাঁকে বাঁকে এসে হাজির হয়েছে, হাজরা পাগলি এবং পাকিস্তানি সেনা, তাদের বোঝার আগেই ঘটিয়েছে বিপর্যয়।
'কামনা বাসনালয়' বইয়ের গল্পগুলিকে কোন তত্ত্বে বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে কিনা জানি না। পরাবাস্তব, জাদুবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিক বলা না গেলেও, মোটাদাগে এই বইয়ের গল্পগুলো প্রান্তিক জীবন ঘেঁষা, বাংলার গ্রাম গঞ্জের প্রকৃতিলগ্ন। কখনো বা বয়ঃসন্ধির মনস্তত্ত্বে রক্ষিত তার নির্মিতি। এভাবে বল্লেও ঠিক বলা হয়ে ওঠে না, হাতড়াতে হয় ফ্রয়েড বা ইয়ুং এর তত্ত্ব। যেমন 'ফেলানির মা' গল্পটির কথক একটি কিশোর, কিশোর বয়সের সরলতার মতোই তার বর্ণনা কিন্তু এই সরলতার গভীরে একটা সূক্ষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা লক্ষণীয়--- ফ্রয়েডের ইডিপাস কম্পেলেক্সে হয়ত তার সমাধান আছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে পাঠককে ভাবনায় ফেলবে। আবার একই গল্পের শেষ মুহূর্তে এসে যখন পাঠক ফেলানির মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করবেন, থমকে যাবেন। যদিও ফেলানির মায়ের মৃত্যুর কারণ প্রসব মুহূর্তের রক্তক্ষরণ, তবুও পাঠক কিছুটা হলেও স্তব্ধ হয়ে যাবেন; প্রসব বেদনাকে নিজের বুকের ভেতর অনুভব করবেন। শেষের এই মোচড় (টুইস্ট) এবং ভাষার স্বকীয়তা ও সাবলীল বর্ণনার মধ্যেই নির্হিত রয়েছে আইয়ুব আল আমিনের গল্পের জাদুরকাঠি। সরল বর্ণনায় গল্পের শুরু হলেও রূপক, উপমা ও চিত্রকল্পের অভিনবত্বে পাঠককে শুরুতেই আইয়ুব আল আমিন গল্পের ভেতরে টেনে নেবার কায়দাটা রপ্ত করেছেন নিপুণ।
জাপানের ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি যার বর্ণনা করেছেন এই বলে, 'আমি যখন লিখি আলাদা করে কোন পরিকল্পনা থাকে না। আমি গল্পটির জন্য অপেক্ষা করি। গল্পটা কেমন হবে সেটা আমি নির্বাচন করি না। আমি কিছু চিত্রকল্প দাঁড় করাই। তারপর গল্পটা পাঠকদের কাছে বুঝিয়ে বলি। আপনি যখন কাউকে কিছু বোঝাবেন তখন আপনাকে সরল হতেই হবে। আপনি হয়ত একমত নাও হতে পারেন। সহজ শব্দ এবং যুতসই মেটাফর; কার্যকারী রূপক। সেটাই আমি করি। খুব সহজভাবে সতর্কতার সাথে সব ব্যাখ্যা করি।' গল্পকার আইয়ুব আল আমিনও এই একই কাজ করেন, বোদ্ধা পাঠক মাত্রই সেটা বুঝবেন। যেমন তাঁর বইয়ের 'জন্মদাগ' গল্পটা শুরু হয়েছে এভাবে, 'সকালের আকাশটা পরিস্কারই ছিলো। একটু পরেই হঠাৎ চারদিক মেঘে অন্ধকার হয়ে এলো। দমকা বাতাসে মেম্বর বাড়ির পেছনের বাঁশগাছগুলো একদম হেলে উঠান ছুঁই ছুঁই হয়ে আবার খাঁড়া হয়ে যাচ্ছে। টিনের চালের ওপর জমে থাকা শুকনো পাতাগুলো বাতাসের তোড়ে দীর্ঘ উঠানের ওপর পড়ে একবার এদিক একবার ওদিক যাচ্ছে পানির ঢেউয়ের মতো। কয়েকটা বক কোথা থেকে উড়ে এসে বাঁশঝাড়ে বসবে কিন্তু পারছে না। বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কাজের বেটি নজুর মা উঠানের শুকনো খড়িগুলো তাড়াহুড়া করে বারান্দায় তুলছে। বারান্দায় আবার কাল রাত থেকে মইরম পাগলিকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে।'
এই রকম সরল বর্ণনা ও উপমা দিয়ে শুরু করে পাঠককে আসল কথাটা বলেন গল্পকার আইয়ুব আল আমিন, যেটা 'জন্মদাগ' গল্পে বলেছেন। ধীরে ধীরে পাঠক আবিস্কার করতে থাকেন বিকৃতযৌনতা, ক্ষমতা, রাজনীতি, ধর্মিয় বৈষম্য কীভাবে যেঁকে বসছে প্রান্তিক সমাজবাস্তবতায়। যেটা বইয়ের 'শরবানু' গল্পেও লক্ষ করবেন পাঠক। যেমন, 'ভাদ্র আশ্বিন মাসে নিশি রাতে এমন হয়। বড় পুষ্করিণীর পানি ছুঁই ছুঁই উপর দিয়ে একটা সারস পাখি সাঁ করে উড়ে গেলে পানিটা কেমন কেঁপে ওঠে। সেই পানিতে আবার জোছনার আলো পড়ে ঝলমল করে কাঁচা আগুনের মতো। মানুষটা প্রথম প্রথম ঘরে আসলে ঠিক এই রকম লাগতো শরবানুর। দিগ্বিদিক ভুলে যেত সে। মানুষটাকে মনে হতো নোনতা বিস্কুট।' শরবানু গল্পের সমাপ্তি ঘটে তার আত্মহত্যা এবং গল্পকথকের কয়েকটা অতিলৌকিক বয়ানের মধ্যে দিয়ে। যদিও শরবানুর মৃত্যুর কারণ নির্যাতন ও মিথ্যা অপবাদ। কিন্তু যখন! 'তোমরা সরো তো। সরো দেহি, পোলাডা তার মায়রে একবার দেহুক। ছেলে মাকে দেখে না। সে আচমকা মায়ের উপর ঢেকে দেয়া আলগা কাপড়টা সরিয়ে দুধের বোঁটায় মুখ লাগায়। মলিন স্তনবৃন্তে কোমল ঠোঁটের স্পর্শে মৃত শরীরটা মুহূর্তে কাঁটা কাঁটা হয়ে ওঠে। কিন্তু সেটা কেউ খেয়াল করে না...'
এই বলে যখন গল্পের ইতি টানেন গল্পকার তখন পাঠক শিউরে ওঠেন। অথচ পাঠকের এই বয়ান অতিনাটকীয় মনে হয় না সাবলীল বর্ণনাশৈলীর মুন্সিয়ানায়। আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো মূলত বিষাদের, গল্পে নিজে কোন সমাধানে না গিয়ে সেই গুরুদায়িত্ব তিনি পাঠকের ওপরেই ছেড়ে দিতে পছন্দ করেন। তবে 'কসকো' এবং 'সিঁন্দুর পোকার ঘর' গল্পদুটি পড়ে পাঠক মৃদু রোমান্টিকতা অনুভব করবেন, কিশোর কিশোরীর মনস্তত্ব ও খুনসুটি এক নির্মলানন্দে কানায় কানায় ভরিয়ে দেবে।
এই বলে যখন গল্পের ইতি টানেন গল্পকার তখন পাঠক শিউরে ওঠেন। অথচ পাঠকের এই বয়ান অতিনাটকীয় মনে হয় না সাবলীল বর্ণনাশৈলীর মুন্সিয়ানায়। আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো মূলত বিষাদের, গল্পে নিজে কোন সমাধানে না গিয়ে সেই গুরুদায়িত্ব তিনি পাঠকের ওপরেই ছেড়ে দিতে পছন্দ করেন। তবে 'কসকো' এবং 'সিঁন্দুর পোকার ঘর' গল্পদুটি পড়ে পাঠক মৃদু রোমান্টিকতা অনুভব করবেন, কিশোর কিশোরীর মনস্তত্ব ও খুনসুটি এক নির্মলানন্দে কানায় কানায় ভরিয়ে দেবে।
তবুও গল্পগ্রন্থটি পাঠ শেষে পাঠক মাত্রেই যে প্রশ্নটির মুখোমুখী হবেন সেটা হচ্ছে, গল্পগুলোকে কি অণুগল্প বলা যায়? নাকি ছোটগল্প বললে যথার্থ বলা হবে? যদিও ছোটগল্পের কাঠামো নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে বাংলা সাহিত্যে। 'শেষ হয়ে হইল না শেষ' রবিঠাকুরের এই প্রবাদ সর্বজন বিদিত। বিদগ্ধ পাঠকদের এই নিয়েও তর্কের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো কি ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে? করলেও কোন কোন বৈশিষ্ট্য তাঁর গল্পে বিদ্যমান? এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব পাঠককে ভাবনায় ফেলবে নিশ্চয়ই।
'কামনা বাসনালয়' বইয়ের বেশ কিছু গল্প যেমন, ইফতার, স্পর্শ, শরবানু, জ্বর, খুন, সমুদ্রস্নান, ফেলানির মা, কামনা বাসনালয়, সিঁন্দুর পোকার ঘর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কথিত ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যগুলোর ভেতর, 'শেষ হয়ে হইল না শেষ' ব্যাপারটা ব্যাপকভাবে থাকলেও পুরোপুরি ছোটগল্প বলাটাও বোধহয় সমীচীন হবে না। কেননা সমঝদার পাঠক এটাও উপলব্ধি করবেন যে, সময়ের সাথে সাথে প্রাণী, প্রকৃতির যেমন রূপান্তর ঘটে তেমনই আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো ছোটগল্পের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে অন্য একটি শিল্পকাঠামোর সংকেত বহন করছে। হয়ত সময়েরও তাই দাবী! সে কী তবে অণুগল্প? সাহিত্যের এই নবীনতম শাখাটি বিশ্বসাহিত্যে জায়গা পাকা করে নিলেও বাংলায় তেমনটি এখনও ঘটেনি। আবার এমনটাও নয় যে বাংলায় কোন কাজই হয়নি অণুগল্প নিয়ে। তথাপি অনেক সমালোচক মনে করেন, অণুগল্পের পূর্বসূরি হচ্ছে প্রাচীন পঞ্চতন্ত্র কিংবা ঈশপের গল্প অথবা বাংলার প্রথম সফল অণুগল্প লেখক বনফুল বা তাঁর 'নিমগাছ' গল্পটি।
আসলে কিন্তু তা নয়, এই গল্পগুলো আকারে ছোট হলেও এর লেখকেরা কেউই সচেতনভাবে অণুগল্প লেখেননি। অণুগল্পের হওয়া উচিত ছোটগল্প থেকেও স্লিম, চরিত্রের বর্ণনা অথবা পরিবেশ, প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলার এখানে সুযোগ নেই বললেই চলে। কেবল মুহূর্তে ঘটে যাবে একটি ঘটনা, বাণী বা উপদেশ থাকবে না, থাকবে বহু গল্পের ইঙ্গিত। মোচড় মৃদু অথবা জোরালো হোক, হতে হবে সাবলীল। সংলাপ থাকতে পারে না থাকলেও সমস্যা নেই, রূপক, উপমা, চিত্রকল্প না থাকলেও ভাষার নান্দনিকতা থাকতেই হবে। কাব্যিক ব্যঞ্জনা থাকলেও যেন কবিতা না হয়ে ওঠে, শব্দসংখ্যা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু চীনা সাহিত্য অণুগল্পের শব্দসংখ্যা বেঁধে দিয়েছেন, (স্মোক লং) ফিকশন বলে। অর্থাৎ একটি সিগেরেট শেষ হতে যতটুকু সময় লাগে। মূলত ছোটগল্প আর অণুগল্পের মূল পার্থক্য হচ্ছে এই, ছোটগল্প তৈরি হয় কতগুলো মুহূর্ত নিয়ে; এখানে কতগুলো ঘটনার কতগুলো দৃশ্যকে আশ্রয় করে এর প্রকাশ ঘটে। আর অণুগল্পে একটি বিশষে মুহূর্ত একক দৃশ্যপটের ভেতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়। স্বল্পকথন ও টানটান উত্তেজনা এই গল্পের বৈশিষ্ট্য।
এক্ষেত্রে আইয়ুব আল আমিনের যে গল্পগুলো অণুগল্প হয়ে উঠতে চায় যেমন, বেলি ফুলের মালা, কামড়, তিল, ঝাপসা, যে কোনদিন রেলগাড়িতে ওঠেনি, শাড়ি গল্পগুলো। তবে 'কামনা বাসনালয়' বইয়ের কিছু গল্পকে কবিতা বলেও দিব্যি চালিয়ে দেয়া যায়, এমনটাও কিন্তু নতুন নয়, বিশ্বসাহিত্যেও অণুগল্পের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে, জনপ্রিয় মার্কিন কবি-গল্পকার স্টুয়ার্ট ডাইবেকের (জ, ১৯৪২) অনেক অণুগল্প গদ্যকবিতা হিসেবে কবিতার কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। সর্বোপরি বলা যায় গল্পকার আইয়ুব আল আমিনের 'কামনা বাসনালয়' বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন এই উদ্ঘাটন কেবল সময়ের দাবী।
-আলোচক
কবির মুকুল প্রদীপ

