বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯

শর্ট ফিকশন বনাম কামনা বাসনালয়


কেবল ছোটগল্পের পাঠকই বোধকরি এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, একটি গল্পপাঠ শেষে আরও অনেকগুলো গল্পের বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠেন। গল্পকারও খুব সচেতনতার সাথে এই কাজটি করে থাকেন। তবে গল্পে কি ঘটল কিংবা ঘটানো হলো তার সত্যমিথ্যা নির্ণয়যোগ্য কোন বিষয় নয়, তথাপি প্রশ্ন ওঠে; প্রশ্ন তোলেন সমালোচক। এই ক্ষণে রবিঠাকুরের বক্তব্যটুকু প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, ‘পোস্ট মাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকতো। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’ গল্পে বাস্তবতার প্রশ্নে আর এক জায়গায় রবিঠাকুর বলেছেন, 'আমার গল্পে বাস্তবের আভাব কখনও ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।' গল্পকার আইয়ুব আল আমিনের 'কামনা বাসনালয়' গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো পড়েও পাঠক এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন, যেমন, 'কামনা বাসনালয়' গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যে প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে তাকে সত্যমিথ্যায় নির্ণয় করা যাবে কিনা জানি না, কিন্তু পাঠক স্বাধীনতার চেতনায় পুনরুজ্জীবিত হবেন। ইতিহাস নির্ভর গল্পগুলোই এমন, যেটা পঠক হুমায়ূন আহমেদের ইতিহাস নির্ভর ছোটগল্পেও লক্ষ করে থাকবেন। কেননা ইতিহাসের পুনর্লেখন গল্পকারের কাজ নয়, ইতিহাসের নতুন সম্ভাবনাকে খুলে দেখানোই গল্প। এই গল্পে--- গল্পকথক কেবল একটিমাত্র চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে গল্পটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন, সে কামালউদ্দিন, কথকের বয়ানে জানতে পারি তার মা মরা মেয়েটি এবং বৃদ্ধ পিতাকে সে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে চিন্তিত। নিজে মুক্তিযুদ্ধে যেতে চেয়েও কোন কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বাকি যে চরিত্র গল্পের বাঁকে বাঁকে এসে হাজির হয়েছে, হাজরা পাগলি এবং পাকিস্তানি সেনা, তাদের বোঝার আগেই ঘটিয়েছে বিপর্যয়।
'কামনা বাসনালয়' বইয়ের গল্পগুলিকে কোন তত্ত্বে বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে কিনা জানি না। পরাবাস্তব, জাদুবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিক বলা না গেলেও, মোটাদাগে এই বইয়ের গল্পগুলো প্রান্তিক জীবন ঘেঁষা, বাংলার গ্রাম গঞ্জের প্রকৃতিলগ্ন। কখনো বা বয়ঃসন্ধির মনস্তত্ত্বে রক্ষিত তার নির্মিতি। এভাবে বল্লেও ঠিক বলা হয়ে ওঠে না, হাতড়াতে হয় ফ্রয়েড বা ইয়ুং এর তত্ত্ব। যেমন 'ফেলানির মা' গল্পটির কথক একটি কিশোর, কিশোর বয়সের সরলতার মতোই তার বর্ণনা কিন্তু এই সরলতার গভীরে একটা সূক্ষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা লক্ষণীয়--- ফ্রয়েডের ইডিপাস কম্পেলেক্সে হয়ত তার সমাধান আছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে পাঠককে ভাবনায় ফেলবে। আবার একই গল্পের শেষ মুহূর্তে এসে যখন পাঠক ফেলানির মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করবেন, থমকে যাবেন। যদিও ফেলানির মায়ের মৃত্যুর কারণ প্রসব মুহূর্তের রক্তক্ষরণ, তবুও পাঠক কিছুটা হলেও স্তব্ধ হয়ে যাবেন; প্রসব বেদনাকে নিজের বুকের ভেতর অনুভব করবেন। শেষের এই মোচড় (টুইস্ট) এবং ভাষার স্বকীয়তা ও সাবলীল বর্ণনার মধ্যেই নির্হিত রয়েছে আইয়ুব আল আমিনের গল্পের জাদুরকাঠি। সরল বর্ণনায় গল্পের শুরু হলেও রূপক, উপমা ও চিত্রকল্পের অভিনবত্বে পাঠককে শুরুতেই আইয়ুব আল আমিন গল্পের ভেতরে টেনে নেবার কায়দাটা রপ্ত করেছেন নিপুণ।






জাপানের ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি যার বর্ণনা করেছেন এই বলে, 'আমি যখন লিখি আলাদা করে কোন পরিকল্পনা থাকে না। আমি গল্পটির জন্য অপেক্ষা করি। গল্পটা কেমন হবে সেটা আমি নির্বাচন করি না। আমি কিছু চিত্রকল্প দাঁড় করাই। তারপর গল্পটা পাঠকদের কাছে বুঝিয়ে বলি। আপনি যখন কাউকে কিছু বোঝাবেন তখন আপনাকে সরল হতেই হবে। আপনি হয়ত একমত নাও হতে পারেন। সহজ শব্দ এবং যুতসই মেটাফর; কার্যকারী রূপক। সেটাই আমি করি। খুব সহজভাবে সতর্কতার সাথে সব ব্যাখ্যা করি।' গল্পকার আইয়ুব আল আমিনও এই একই কাজ করেন, বোদ্ধা পাঠক মাত্রই সেটা বুঝবেন। যেমন তাঁর বইয়ের 'জন্মদাগ' গল্পটা শুরু হয়েছে এভাবে, 'সকালের আকাশটা পরিস্কারই ছিলো। একটু পরেই হঠাৎ চারদিক মেঘে অন্ধকার হয়ে এলো। দমকা বাতাসে মেম্বর বাড়ির পেছনের বাঁশগাছগুলো একদম হেলে উঠান ছুঁই ছুঁই হয়ে আবার খাঁড়া হয়ে যাচ্ছে। টিনের চালের ওপর জমে থাকা শুকনো পাতাগুলো বাতাসের তোড়ে দীর্ঘ উঠানের ওপর পড়ে একবার এদিক একবার ওদিক যাচ্ছে পানির ঢেউয়ের মতো। কয়েকটা বক কোথা থেকে উড়ে এসে বাঁশঝাড়ে বসবে কিন্তু পারছে না। বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কাজের বেটি নজুর মা উঠানের শুকনো খড়িগুলো তাড়াহুড়া করে বারান্দায় তুলছে। বারান্দায় আবার কাল রাত থেকে মইরম পাগলিকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে।'
এই রকম সরল বর্ণনা ও উপমা দিয়ে শুরু করে পাঠককে আসল কথাটা বলেন গল্পকার আইয়ুব আল আমিন, যেটা 'জন্মদাগ' গল্পে বলেছেন। ধীরে ধীরে পাঠক আবিস্কার করতে থাকেন বিকৃতযৌনতা, ক্ষমতা, রাজনীতি, ধর্মিয় বৈষম্য কীভাবে যেঁকে বসছে প্রান্তিক সমাজবাস্তবতায়। যেটা বইয়ের 'শরবানু' গল্পেও লক্ষ করবেন পাঠক। যেমন, 'ভাদ্র আশ্বিন মাসে নিশি রাতে এমন হয়। বড় পুষ্করিণীর পানি ছুঁই ছুঁই উপর দিয়ে একটা সারস পাখি সাঁ করে উড়ে গেলে পানিটা কেমন কেঁপে ওঠে। সেই পানিতে আবার জোছনার আলো পড়ে ঝলমল করে কাঁচা আগুনের মতো। মানুষটা প্রথম প্রথম ঘরে আসলে ঠিক এই রকম লাগতো শরবানুর। দিগ্বিদিক ভুলে যেত সে। মানুষটাকে মনে হতো নোনতা বিস্কুট।' শরবানু গল্পের সমাপ্তি ঘটে তার আত্মহত্যা এবং গল্পকথকের কয়েকটা অতিলৌকিক বয়ানের মধ্যে দিয়ে। যদিও শরবানুর মৃত্যুর কারণ নির্যাতন ও মিথ্যা অপবাদ। কিন্তু যখন! 'তোমরা সরো তো। সরো দেহি, পোলাডা তার মায়রে একবার দেহুক। ছেলে মাকে দেখে না। সে আচমকা মায়ের উপর ঢেকে দেয়া আলগা কাপড়টা সরিয়ে দুধের বোঁটায় মুখ লাগায়। মলিন স্তনবৃন্তে কোমল ঠোঁটের স্পর্শে মৃত শরীরটা মুহূর্তে কাঁটা কাঁটা হয়ে ওঠে। কিন্তু সেটা কেউ খেয়াল করে না...'
এই বলে যখন গল্পের ইতি টানেন গল্পকার তখন পাঠক শিউরে ওঠেন। অথচ পাঠকের এই বয়ান অতিনাটকীয় মনে হয় না সাবলীল বর্ণনাশৈলীর মুন্সিয়ানায়। আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো মূলত বিষাদের, গল্পে নিজে কোন সমাধানে না গিয়ে সেই গুরুদায়িত্ব তিনি পাঠকের ওপরেই ছেড়ে দিতে পছন্দ করেন। তবে 'কসকো' এবং 'সিঁন্দুর পোকার ঘর' গল্পদুটি পড়ে পাঠক মৃদু রোমান্টিকতা অনুভব করবেন, কিশোর কিশোরীর মনস্তত্ব ও খুনসুটি এক নির্মলানন্দে কানায় কানায় ভরিয়ে দেবে।

তবুও গল্পগ্রন্থটি পাঠ শেষে পাঠক মাত্রেই যে প্রশ্নটির মুখোমুখী হবেন সেটা হচ্ছে, গল্পগুলোকে কি অণুগল্প বলা যায়? নাকি ছোটগল্প বললে যথার্থ বলা হবে? যদিও ছোটগল্পের কাঠামো নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে বাংলা সাহিত্যে। 'শেষ হয়ে হইল না শেষ' রবিঠাকুরের এই প্রবাদ সর্বজন বিদিত। বিদগ্ধ পাঠকদের এই নিয়েও তর্কের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো কি ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে? করলেও কোন কোন বৈশিষ্ট্য তাঁর গল্পে বিদ্যমান? এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব পাঠককে ভাবনায় ফেলবে নিশ্চয়ই।
'কামনা বাসনালয়' বইয়ের বেশ কিছু গল্প যেমন, ইফতার, স্পর্শ, শরবানু, জ্বর, খুন, সমুদ্রস্নান, ফেলানির মা, কামনা বাসনালয়, সিঁন্দুর পোকার ঘর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কথিত ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যগুলোর ভেতর, 'শেষ হয়ে হইল না শেষ' ব্যাপারটা ব্যাপকভাবে থাকলেও পুরোপুরি ছোটগল্প বলাটাও বোধহয় সমীচীন হবে না। কেননা সমঝদার পাঠক এটাও উপলব্ধি করবেন যে, সময়ের সাথে সাথে প্রাণী, প্রকৃতির যেমন রূপান্তর ঘটে তেমনই আইয়ুব আল আমিনের গল্পগুলো ছোটগল্পের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে অন্য একটি শিল্পকাঠামোর সংকেত বহন করছে। হয়ত সময়েরও তাই দাবী! সে কী তবে অণুগল্প? সাহিত্যের এই নবীনতম শাখাটি বিশ্বসাহিত্যে জায়গা পাকা করে নিলেও বাংলায় তেমনটি এখনও ঘটেনি। আবার এমনটাও নয় যে বাংলায় কোন কাজই হয়নি অণুগল্প নিয়ে। তথাপি অনেক সমালোচক মনে করেন, অণুগল্পের পূর্বসূরি হচ্ছে প্রাচীন পঞ্চতন্ত্র কিংবা ঈশপের গল্প অথবা বাংলার প্রথম সফল অণুগল্প লেখক বনফুল বা তাঁর 'নিমগাছ' গল্পটি।
আসলে কিন্তু তা নয়, এই গল্পগুলো আকারে ছোট হলেও এর লেখকেরা কেউই সচেতনভাবে অণুগল্প লেখেননি। অণুগল্পের হওয়া উচিত ছোটগল্প থেকেও স্লিম, চরিত্রের বর্ণনা অথবা পরিবেশ, প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলার এখানে সুযোগ নেই বললেই চলে। কেবল মুহূর্তে ঘটে যাবে একটি ঘটনা, বাণী বা উপদেশ থাকবে না, থাকবে বহু গল্পের ইঙ্গিত। মোচড় মৃদু অথবা জোরালো হোক, হতে হবে সাবলীল। সংলাপ থাকতে পারে না থাকলেও সমস্যা নেই, রূপক, উপমা, চিত্রকল্প না থাকলেও ভাষার নান্দনিকতা থাকতেই হবে। কাব্যিক ব্যঞ্জনা থাকলেও যেন কবিতা না হয়ে ওঠে, শব্দসংখ্যা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু চীনা সাহিত্য অণুগল্পের শব্দসংখ্যা বেঁধে দিয়েছেন, (স্মোক লং) ফিকশন বলে। অর্থাৎ একটি সিগেরেট শেষ হতে যতটুকু সময় লাগে। মূলত ছোটগল্প আর অণুগল্পের মূল পার্থক্য হচ্ছে এই, ছোটগল্প তৈরি হয় কতগুলো মুহূর্ত নিয়ে; এখানে কতগুলো ঘটনার কতগুলো দৃশ্যকে আশ্রয় করে এর প্রকাশ ঘটে। আর অণুগল্পে একটি বিশষে মুহূর্ত একক দৃশ্যপটের ভেতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়। স্বল্পকথন ও টানটান উত্তেজনা এই গল্পের বৈশিষ্ট্য।
এক্ষেত্রে আইয়ুব আল আমিনের যে গল্পগুলো অণুগল্প হয়ে উঠতে চায় যেমন, বেলি ফুলের মালা, কামড়, তিল, ঝাপসা, যে কোনদিন রেলগাড়িতে ওঠেনি, শাড়ি গল্পগুলো। তবে 'কামনা বাসনালয়' বইয়ের কিছু গল্পকে কবিতা বলেও দিব্যি চালিয়ে দেয়া যায়, এমনটাও কিন্তু নতুন নয়, বিশ্বসাহিত্যেও অণুগল্পের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে, জনপ্রিয় মার্কিন কবি-গল্পকার স্টুয়ার্ট ডাইবেকের (জ, ১৯৪২) অনেক অণুগল্প গদ্যকবিতা হিসেবে কবিতার কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। সর্বোপরি বলা যায় গল্পকার আইয়ুব আল আমিনের 'কামনা বাসনালয়' বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন এই উদ্ঘাটন কেবল সময়ের দাবী।


-আলোচক
কবির মুকুল প্রদীপ

বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

জাদুবাস্তববাদ সাহিত্যকে কেন উত্তর-আধুনিক আত্মসাৎ করেছে?

মজার ব্যাপার হলো লাতিন আমেরিকায় যখন 'লো রেয়াল মারাভিঝোসে' [আশ্চার্য বাস্তব] রচনারীতি কিংবা মধ্য যুগের বারোকরীতি অবলম্বন করে লেখা হচ্ছে একের পর এক উপন্যাস এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাস্তববাদী ইউরোপ তখন ডাডাইজম, সুররিয়ালিজমে মেতে আছে। কিন্তু বিংশ শতকের সত্তরের দশকে যদি উত্তর-আধুনিক কালপর্বের শুরু হয়, তাহলে বলতে হয় 'ম্যাজিক রিয়ালিজমে'র প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছিলো তারও বহু আগে। জার্মানির চিত্র সমালোচক রোঁ-হ এর জাদুবাস্তববাদ শব্দের প্রয়োগ থেকেই যদি হিসেব করি, তাহলেও ১৯২০-২২ হবে--- মানে উত্তর-আধুনিক কালপর্বের আগে। বলা হয়, জার্মানি হয়ে স্পেন, ফ্রান্স, তার পরে লাতিনে আসে এই জাদুবাস্তববাদ! সমালোচকদের এই মত আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না, কিন্ত এই তত্ত্ব উড়িয়ে দেয়ার মতো তথ্য-তত্ত্ব আমার কাছে অনেক আছে। উদ্দেশ্য আমার তা নয়, তথাপি শেকড় থেকে না হাতড়ালে তল পাওয়া মুশকিল। তাই শেকড় থেকেই এগোনো যাক।
মূলত লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদের প্রথম প্রবক্তা বলা হয় আলেহ কার্পেন্তিয়র, এবং মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসকে। আলেহ কার্পেন্তিয়র [১৯০৪,১৯৮০] একজন কুবান লেখক। ক্যারিবিয়নের একটি বৃহত্তর দ্বীপ এই কুবা, আয়তন ১১৪,৫২৪ বর্গ কিলোমিটার। কুবার ইতিহাস হাতড়াচ্ছি তার কারণ, লাতিন আমেরিকার ইতিহাস এখান থেকেই কিছুটা হলেও স্পষ্ট হবে, আর লাতিনের ইতিহাস না জেনে তাদের সাহিত্য বোঝা প্রায় অসম্ভব। 'ক্রিস্টফার কলম্বাস' প্রথম এই কুবাকে দেখতে পেয়েছিলেন ২৮ অক্টোবর ১৪৯২তে, আর বলেছিলেন, 'আজ অব্দি যত দ্বীপ মানুষ দেখেছে, তার মধ্যে সবচে সুন্দর।' সমৃদ্ধি তার সৌন্দর্যের বর্ণনা থেকেই বুঝেছেন নিশ্চয়ই? আর এই সমৃদ্ধির কারণেই রানি ইসাবেলের নামে দ্বীপটা তিনি দখল করেন, খোলেন বাণিজ্যকেন্দ্র। এই দ্বীপে বসবার যাঁরা করতেন তাদের বলা হতো ইন্ডিয়ান, উৎপাদনে সমৃদ্ধ ছিলো বলেই এই ইন্ডিয়ানদের কাজ ছিলো কেবল সন্তান জন্ম দেয়া। পরে ক্রিস্টফার কলম্বাস চলে গেলে, ১৫১১তে এলেন এম্পানিওল দোন দিয়েগো দে বেলাথকেথ; তার কিছুদিন পরেই এম্পানিওলরা এক শুমারিতে [মানে কত ইন্ডিয়ান আছে গণনা করার জন্য] দশ লক্ষ ইন্ডিয়ানদের গুলি করে হত্যা করেন, এবং পুড়িয়ে মারেন। এক পর্যায়ে এই হত্যা ও পুড়িয়ে মারা তাদের মজার খেলা হয়ে ওঠে, কেননা ইন্ডিয়ানরা সব নাস্তিক; খ্রিস্টান হওয়াতেও তাদের কোন আগ্রহ নেই। এই হত্যার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে লাতিনের আরও বহু দেশে, এক পর্যায়ে দেখা যায় আর তেমন ইন্ডিয়ান নেই সেখানে; তখন স্পেনীয়দের মনে হলো তারা একটা ভুল করেছেন! নিকৃষ্ট কাজ করবে কে? স্পেনীয়রা নিশ্চয়ই নয়, তারা যে কোন্‌কিস্তাদোর, ক্যাথেলিক!
কাজেই সহজ সমাধান হিসেবে তারা আফ্রিকার নিগ্রোদের আনতে শুরু করে দিলো, যেহেতু তাদের মিলতো সস্তায়। এভাবে চলতে চলতে নিগ্রো হয়ে উঠেছিলো প্রায় এম্পানিওলদের সমান, মানে ৫০-৬০%। পরে ইংরেজ এলো, কিন্তু বেশিদিন টিকলো না, ১৭৬৩ মধ্যেই কুবাকে ফিরিয়ে দিলো এম্পানিওলদের। হঠাৎ কুবায় বসবাসকারীরাই একদিন বুঝলো, দেশের সম্পদ চলে যাচ্ছে এম্পানিয়ায় ও রোমের পোপের কোষাগারে, ফলত ১৮১৯ কুবার এম্পানিওলরা স্পেনের এম্পানিওলদের বিরুদ্ধেই বিপ্লব ঘোষণা করলেন। এই সময়ে এসে লাতিনের প্রায় সব দেশগুলোই এম্পানিওল এবং ফরাসি উপনিবেশ কেটে বেরিয়েছে, কেবল কুবা বাদে, তাই শুরু হলো একের পর এক অভ্যুত্থানঃ ১৮২৬, ১৮২৮, ১৮৩০, ১৮৪৮, ১৮৫১, ১৮৫৫তে। সাদা-রা তখন আইনিভাবে কালোদের আন্দোলন জটিল করে তুল্লো, কোন কালো সাদা বিয়ে করতে পারবে না, পাবে না কোন সরকারি চাকরি, ব্যবসাও গড়তে পারবে না, পাবে না কোন আইনি সহায়তাও। তবুও ১৮৬৮তে কার্লোস মানুয়েল দে সেস্‌পেদেসের [ইতিহাসের প্রথম শ্বেতাঙ্গ ধনী ভালো মানুষ] যার হাতে ইন্ডিয়ান ও কালোরা মুক্ত হলো।
বলে রাখা ভালো, যে পুঁজিবাদ কিংবা শিল্পবিপ্লবের কোলে জন্ম নিয়েছে উত্তর-আধুনিক, লাতিন আমেরিকা উপনিবেশ মুক্ত হলেও তেমন কোন পুঁজি বা শিল্প কখনওই গড়ে ওঠেনি। তথাপি কেন জাদুবাস্তববাদ রচনা উত্তর-আধুনিক? সেটা বোঝার জন্যই ওপরের উদ্ধিতিটুকু দরকার ছিলো, এবং কার্পেন্তিয়রের রচনা বুঝতেও। কেননা আলেহ কার্পেন্তিয়র কখনোই তাঁদের ইতিহাসের বাইরে গিয়ে সাহিত্যের কথা ভাবেননি, এবং নিগ্রো, ইন্ডিয়ানদের বাদ দিয়ে তো নয়ই। কিন্তু ধারণা করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন তিনি ফ্রান্সের পারীতে গিয়েছিলেন পাড়াশোনা করতে, ফ্রান্সে তখন ডাডাবাদ, নেগ্রিচুড, পরাবাস্তববাদ ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত হচ্ছিলো, সাথে ফ্রয়েড, ইয়ুং এর মনস্তত্ত্বও---ফলত এসব আন্দোলনের প্রভাব তাঁর ওপর ছিলো; এখানে তিনি বন্ধু পেয়েছিলেন মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস, এবং নেগ্রিচুডের প্রধান প্রবক্তা এমে সেজেয়ারকে, ছিলো শেক্সপীয়র অফ কোম্পানি, জেমস জয়েসের মতো জটিল উপন্যাসিক। যদিও এসব আন্দোলনের প্রভাব কার্পেন্তিয়র ও আস্তুরিয়াস দুজনেই অস্বীকার করেছেন।
তারও পরে ১৯৪৯তে বেরোলো কার্পেন্তিয়রের উপন্যাস 'এই মর্তের রাজত্ব' তখন সমালোচকরা মনে করলেন, পারীতে পড়াশোনার সময়ই কার্পেন্তিয়রের ভেতর 'এই মর্তের রাজত্বে'র প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিলো। আর কার্পেন্তিয়র বললেন 'হাইতিতে গিয়েই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ম্যাজিক রিয়ালিজম, কারণ লাতিন আমেরিকা হচ্ছে সেই পৃথিবী যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমান্ত কেমন যেন রহস্যসম্ভারে 'চিরস্থায়ীভাবে' অস্পষ্ট হয়ে আছে, কারণ সেখানে বাস্তবই চমৎকার আর চমৎকারই বাস্তব।' এই বক্তব্যের সূত্র থেকে সমালোচকদের দুইটা ধারণা নস্যাৎ করে দেয়া যায়, যেমন জার্মানি থেকে স্পেন, ফ্রান্স হয়ে লাতিন আমেরিকায় এসেছে জাদুবাস্তববাদ, আর উত্তর-আধুনিক দর্শন তো আলোকবর্ষ দূর কি বাত! তবে এখানে আর একটা সত্য আছে, তা হচ্ছে স্পেন ও ফরাসী উপনিবেশ, লাতিনকে এই দুই উপনিবেশই চুষে খেয়েছে, ইচ্ছামতো মেরেছে, আর উপনিবেশের প্রভাবতো থাকেই সাহিত্যের ওপর। কিন্তু আমরা যদি কার্পেন্তিয়রের উপন্যাস 'এই মর্তের রাজত্ব' গল্প 'উৎসের দিকে'র গভীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তাহলে দেখতে পাই, আধুনিক এম্পানিওল ও ইউরোপের মস্তিষ্কসম্বল বাস্তবতা সেখানে ভেঙে চুরমার করে দেয়া হয়েছে।
ইউরোপী আধুনিকতা মূলত চাপিয়ে দেয়া কিছু গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ ধারণা, যেমন সাদা ভালো, কালো নিকৃষ্ট, ধর্ম, মার্ক্সবাদের মতো কিছু আদর্শবাদ। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট করেছে। আমরা জানি উত্তর-আধুনিক এই কেন্দ্রিয় ধারণাসমূহ ভেঙে দেয়, সমালোচনা করে আদর্শবাদেরও, তৈরি করে আরও কিছু ন্যারেটিভ আর খোঁজ করে অস্তিত্বের। কাকতালিও হলেও লাতিনের সাহিত্যের এই অনুসন্ধান জরুরি হয়ে পড়েছিলো, কারণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের থেকে কিনে আনা নিগ্রো কৃতদাসদের এম্পানিওল ও ফরসী উপনিবেশের ফলে অস্তিত্বের এক ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছিলো। তাই নিগ্রোদের পূর্বসূত্রে বহন করা সংস্কৃতি ছিলো কেবল স্মৃতি নির্ভর, আর স্মৃতির তো বিভ্রম হতে পারে, হতে পারে বিলুপ্ত। লক্ষণীয় কার্পেন্তিয়র লাতিনের সাহিত্যকে নিগ্রো ও ইন্ডিয়ানদের বাদ দিয়ে ভাবতে চাননি; পারীতে কার্পেন্তিয়র ও আস্তুরিয়াসের পড়াশোনার বিষয়ও ছিলো পুরাণ এবং প্রাচীন অলংকার।
ফলত কার্পেন্তিয়রের 'এই মর্তের রাজত্ব' উপন্যাসে চরিত্র যেমন ঐতিহাসিক কিন্তু আবার ঐতিহাসিকও নয়, কেননা ইতিহাসকে এখানে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু আবার ফিরে এসেছে বাস্তবে; বাস্তবের সাথে স্বপ্ন মিশে তৈরি হয়েছে এমন এক অস্পষ্ট ধারণা যা অলৌকিক, কুহক। উপন্যাসের মূল ন্যারেটর এক ক্রীতদাস যার নাম তি-নোয়েল---আর গল্পের শুরু ১৭৬০ সালে, যখন মাকান্দাল [সেও এক নিগ্রো ক্রীতদাস] ফরাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো। পরের অংশ ফরাসি বিপ্লবের শুরু থেকে ১৮০২ অব্দি; তারপর ১৮২০তে আঁরি তিস্তফের পতন এবং তার মৃত্যুর বিবরণ দিয়ে শেষ। এই চারটি অংশ মিলিয়েই হচ্ছে উপন্যাস আর এই চারটি অংশকেই যে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে সে তি-নোয়েল, সে এই চারটি অংশতেই আছে; কেননা সে যেমন কালো জগতের মানুষ, তেমনই সাদাদেরও খুব কাছে থেকে চেনে---কারণ সে একজন সাদার ক্রীতদাস। কার্পেন্তিয়র এই উপন্যাসে কেবল ম্যাজিক রিয়ালিজমের সূত্রগুলোই খুলে দেখাননি, দেখিয়েছেন বিদ্রোহ আর স্বাধীনতার বিভিন্ন রূপ, আর সবগুলো বিদ্রোহই আমরা দেখছি এক ক্রীতদাসের চোখ দিয়ে, সে অশিক্ষিত---বিশ্বাস করে অলৌকিক শক্তির, পৃথিবীর বাইরের কোন অন্য জগতের, তার আছে তুখোড় কল্পনাশক্তি ও অনুভূতি, আছে আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা সংস্কার, বিশ্বাস, পুরাণ ও তাদেরই স্থবির রূপগুলো। ক্রীতদাস ছাড়া কেই-বা বোঝে স্বাধীনতার অর্থ!
মাকান্দালও একজন ক্রীতদাস, তার একটা হাত প্রভুরা কেটে ফেলেছে--- তারপর সে একদিন পালিয়ে চলে যায় জঙ্গলে। ক্রীতদাস হিসেবে তার আর কোন দাম নেই বলে প্রথমে কেউ তার কোন খোঁজ করেনি, অথচ একদিন টের পাওয়া যায় তার অস্তিত্ব--- যখন পর-পর অজস্র শ্বেতাঙ্গ মারা যায়। কে তবে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী? নিশ্চয়ই মাকান্দাল? তাই হঠাৎ তাকে খোঁজার ধুম পড়ে যায়, কিন্তু সেতো পরাশক্তির অধিকারী, জানে জাদু---কেউ তার কোন হাদিশ পায় না।
'একদিন বিকেলে তারা [শ্বেতাঙ্গরা] যখন হুমকি দিলে যে তার পাছায় তারা একতাল বন্দুকের গুলি ঠুশে দেবে, বাঁকা পায়ের সেই ফুলাহ্‌ শেষ অব্দি সব কথা ফাঁস করে দিলে। মাকান্দাল, সেই যার এক হাত কাটা গেছে, সেই নুলো কি-না এখন হয়ে উঠেছে রাদাদের বিশ্বাস, সংস্কার আর অনুষ্ঠানের এক 'বুনগান', এখন তার মধ্য সঞ্চারিত হয়েছে পরামানুষিক সব শক্তি ও ক্ষমতা, কেননা বেশ কিছুবার তারই ওপর ভর করেছিলো বড়ো-বড়ো সব দেবতারা, আর তাই নিজেই এখন সে হয়ে উঠেছে গরলদেব। অন্য জগতের শাসনকর্তাদের চরম কর্তৃত্ব এখন ভর করেছে তার মধ্যে, সে ঘোষণা করেছে উচ্ছেদের জেহাদ, সাদাদের একেবারে নির্মূল করে দেয়ার জন্য এখন সে নির্বাচিত। সেই এখন আদিষ্ট হয়েছে সান্তো দেমিঙ্গোতে স্বাধীন নিগ্রোদের এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য। হাজার হাজার ক্রীতদাস এখন তাকে অন্ধের মতো মানে, বিষের অগ্রগতিকে রোধ করার সাধ্য কারো নেই। এই উদ্‌ঘাটন খামারের মধ্যে কষাঘাতের ঘূর্ণিঝড় লেলিয়ে দিলে। আর যখন গনগনে রোষে ছোঁড়া গাদাবন্দুকের জমকালো গুলি কালো খেচরটির নাড়িভুঁড়ি ছিটকে দিলে, এক দূত পাঠানো কাপের উদ্দেশে। চারপাশে যত পুরুষ পাওয়া গেল, সেই দিনই বিকেলে তাদের জড়ো করা হলো মাকান্দালকে খুঁজে বার করতে। সবুজ মাংস, পোড়া খুর, কিলবিলে কীটের দুর্গন্ধেভরা সমভূমি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠলো ডালকুত্তার ঘেউ ঘেউ আর জঘন্য সব খিস্তিতে।' [এই মর্তের রাজত্ব, আলেহ কার্পেন্তিয়র]

চরনারীতির এই ধারায় উত্তর-আধুনিক অনেক বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান, যেমন এই উপন্যাসে কোন সুসংলগ্ন কাঠামো নেই, নেই কোন গ্রান্ড ন্যারেটিভ ধারণা, ভাষা এখানে আধুনিক এম্পানিওল নয় বরং এক মূর্খ ক্রীতদাসের। সময়কে ইচ্ছামতো চালাচালি করার ফলে ইতিহাস আর বাস্তব একাকার হয়ে গেছে, খোঁজা হয়েছে লাতিন আমেরিকার মানুষের অস্তিত্ব, বিশেষভাবে ইন্ডিয়ান ও নিগ্রোদের। যা মেটাফিকশনের নমুনা হয়ে ওঠে, আর আমরা জানি উত্তর-আধুনিক রচনার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য মিলে এই মেটাফিকশন, যার ধারণা আমাদের দিয়েছেন উইলিয়াম এইচ গাস ১৯৭০ সালে, পরে আরও বিস্তারিতভাবে তাত্ত্বিক লিন্ডা হাসিয়েনে। আর এই রচনা জাদুবাস্তববাদ হয়ে ওঠে তখন যখন আমরা জানতে পারি মাকান্দালের কোন অলৌকিক শক্তি নেই, সাদারা তাকে ধরে এনে নিগ্রোদের সামনেই যখন তাকে গুলি করে হত্যা করে, কিন্তু নিগ্রোরা তাতে আনন্দিত হয়, তারা বলে ভালোই হয়েছে, এবার সে আরও পরালৌকিক শক্তির অধিকারী হয়ে ফিরে আসবে। যেমন---
'রাত্তিরে তাদের ছাউনি আর কুঠুরি থেকে নিগ্রোরা একে অপরের সাথে তথ্যবিনিময় করে, সঙ্গে থাকে প্রবল উল্লাস, আর অদ্ভুত যত খবরঃ এক সবুজ গিরগিটি নাকি তামাকপাতার গোলার ছাদে তার পিঠ গরম করে শুয়েছিলো; কেউ সেদিন দিনে-দুপুরে দেখেছে যে এক নিশিপোকা উড়ে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়; এক তাগড়াই কুকুর তার সব লোম কাটা দিয়ে উঠেছে, বাড়ির মধ্যে থেকে হুড়মুড় করে ছুটে বেরিয়ে এসেছিলো, মুখে ছিলো হরিণের মাংসের এক রাং; এক গাঙচিল সমুদ্র থেকে এতো দূরে! তাজ্জব! পেছনের বারান্দায় উকুন ঝেড়ে চলে গিয়েছে। তারা সবাই জানতো যে সবুজ গিরগিটি, নিশিপোকা অদ্ভুত কুকুর বা অবিশ্বাস্য গাঙচিল আসলে নানারকম ছদ্মবেশ ছাড়া কিছু নয়। আর মাকান্দাল যেহেতু নানারকম চেহারা নিতে পারে-খুরওয়ালা জন্তু, পাখি, মাছ আর পোকামাকড়ের- অতএব সে রোজ রাতে আসে সমভূমির খামারে, তার বিশ্বাসী অনুচরদের ওপর নজর রাখতে, আর এটাও জেনে নিতে যে, সে যে একদিন ফিরে আসবে, এ-বিষয়ে এখনও তাদের আস্থা আছে কি না। এই-ঐ? রূপান্তর, যাতেই হোক না কেন, এই এক হাতের মানুষটি আছে সবখানে- বিশেষত এমন যখন তার জীবজন্তু ছদ্মবেশ পরার অতিলৌকিক ক্ষমতা আছে। একদিন ডানা নেড়ে, অন্যদিন খুরে ঠকঠক তুলে, কদম-কদম বুকে হেঁটে, সে এবার প্রভু হয়ে উঠেছে পাতালের সব স্রোতগুলির আর এইভাবে সে এখন শাসন করে সারা দ্বীপ। অসীম তার ক্ষমতা। সে যেমন অনায়াসেই পারে কোনো মাদী ঘোড়ার সাথে সঙ্গম করতে, তেমনি পারে কোনো চৌবাচ্চার ঠান্ডায় বিশ্রাম নিতে; যেমন দুলতে পারে কোনো দোদুল ডাল থেকে তেমনি গলে যেতে পারে কোনো চাবকি ফোকর দিয়ে; কুকুর তাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না; ইচ্ছে মতো সে বদলে ফেলতে পারে তার ছায়া। এই যে এক নেগ্রো মেয়ে এমন এক ছেলের জন্ম দিলো মুখটা বুনো বরার, সে তো তার জন্য। রাত্তিরে সে দেখা দেয় রাস্তাঘাটে, গায়ে কোনো ছাগলের চামড়া, মাথায় দাউ দাউ শিং। একদিন সে নিশ্চয়ই দেবে মহাবিদ্রোহের সংকেত, আর ঐ দূর অতীতের প্রভুরা-যঁদের পুরোভাগে আছেন পথের দেবতা দম্বোলা আর তলোয়ারের দেবতা ওগুন-তাঁরা নিয়ে আসবেন বজ্র আর বিদ্যুৎ আর লাগাম ছিঁড়ে বার করে দেবেন ঘূর্ণিঝড় যা মানুষের সব হাতের কাজ চুকিয়ে দেবে। সেই মহান লগ্নে- তি নোয়েল বললে- সাদাদের রক্ত বয়ে যাবে ঝরনা দিয়ে আর লোয়ারা-আনন্দ উচ্ছল- সেই ঝরনায় গুজে দেবে তাদের মুখ, আর যতক্ষণ না ফুশফুশ ভরে যবে কানায়-কানায়, পান করেই চলবে একটানা।' [এই মর্তের রাজত্ব, আলেহ কার্পেন্তিয়র]
এরপর এই ধারায় লাতিনের অনেক লেখক গল্প-উপন্যাস লেখেন--- যেমন, দেমেত্রিও আগিলেরা মালতার, হুয়ান রুলফো, কার্লোস ফুয়েন্তেস, গ্রাবিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, মারিও ভার্গাস ঝোসা, বোর্হেস যেহেতু ফ্যাসিবাদী তাই তার কথা বললাম না। আর হুয়ান রুলফোর 'পেদ্রো পারামো'কে তো মেটাফিকশনের আলোকে অনেক আলোচকই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন, তবে মনে রাখতে হবে উত্তর-আধুনিক তত্ত্ব বিকশিত হওয়ার অনেক আগেই এইসব রচনা লেখা হয়েছে। বলা হয় বিংশ শতকের সত্তরের দশকে উত্তর-আধুনিক তত্ত্ব ডালপালা মেলেছে, তথাপি উত্তর-আধুনিক রচনার অনেক বৈশিষ্ট্য লাতিনের জাদুবাস্তববাদ সাহিত্য বিদ্যমান বলেই একে উত্তর-আধুনিক আত্মসাৎ করেছে। যেমন 'পেদ্রো পারামো'কে বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টা এখানে আরও স্পষ্ট হবে। এই উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখি মূল ন্যারেটর তার অসুস্থ মাকে কথা দিচ্ছে যে তার পিতা 'পেদ্রো পারামো' যে কিনা মায়ের ধন-সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তার থেকে তা উদ্ধার করবে। এবং কথা দেয়া হতেই মা মারা যাবে। আর মৃত্যু শয্যায় মাকে কথা দিয়েছে বলেই, একদিন সে বেরিয়ে পড়ে পিতার উদ্দেশে কোমালা; [কোমালা লেখকের কল্পিত গ্রাম] যেখানে পিতা পেদ্রো পারামো থাকেন।
উপন্যাস যতই এগোতে থাকে আমরাও ততই পেছোতে থাকি, পথে ন্যারেটরের সাথে যাদেরই দেখা হয়, তারাই গল্পের ন্যারেটর হয়ে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়, পরক্ষণেই টের পাই তারা কেউ জীবিত নয়, মানে ভূত--- কোমালার পথে দিনে কেবল ধূ ধূ বিরান প্রান্তর, রুক্ষ, কোথাও এতটুকু জল পর্যন্ত নেই, কেবলি ভগ্নস্তূপ। রাতে এখানে জেগে ওঠে মানুষ, চারিদিকে শোনা যায় ফিসফাস, খুরে ঠকঠক তুলে ছোটে এক ঘোড়া--- আর আমরা হতবাক হয়ে বুঝতে পারি পেদ্রো পারামো ছিলেন এক লোভী, বর্বর, কামুক শাসক---আর তার বল্গাহীন দুর্নীতির কাহন। ছিলেন! মানে নেই, বহু আগেই সেও খুন হয়েছে--- এমনকি গল্পের ন্যারেটরও কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে। গল্প যেহেতু বলছে ভূত তাই তার বক্তব্য খাপছাড়া, কোথাও সুসংলগ্ন নয়, তবুও এই খাপছাড়া বক্তব্য আমাদের খুলে দেখায় লাতিনের অণুবিশ্ব, যেখানে খুন, যৌনতা, দখল, বল্গাহীন অজাচার যেন সেখানকার মানুষের নিয়তির মতো।
আর এই উপন্যাস যা কিনা লাতিনের ইতিহাস হয়ে আছে, সেখানে মেটাফিকশনের প্রায় সকল উপকরণই লক্ষণীয়। আগেও বলেছি, মেটাফিকশন হচ্ছে উত্তর-আধুনিক রচনার কিছু প্রবণতার সমষ্টি--- যেমন, গল্পের ভেতর তৈরি হবে গল্প, নির্দিষ্ট কাঠামো থাকবে না, চরিত্রেরা এখানে ন্যারেটর হয়ে গল্পে বাঁক বদল করে দেবে, এমনকি পাঠকও হয়ে যেতে পারে ন্যারেটর---তবে তারা সকলেই জানবে যে তারা গল্পের ভেতরেই আছে। যার উৎকৃষ্ট নমুনা গ্রাবিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একশ বছরের নিঃসঙ্গতা, হোমারের মহাকাব্য ওডিসি, সার্ভেন্তেসের দন কিহোতে রুশদীর মিড নাইট চিলড্রেন। মার্কেসের রচনায় আরও কিছু উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আছে, যেমন, প্যারোডি, আয়রনি, প্যারানইয়া তবে সেসবের আর বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না, তাহলে আর শেষ হবে না এই প্রবন্ধ। তথাপি আমার আলোচনার মূল বিষয় নিশ্চয়ই পরিস্কার হয়েছে? শেষ করার আগে একটা কথাই বলি যে, তত্ত্ব কখনই সাহিত্য নয়, উৎকৃষ্ট সাহিত্যই হয়ে যায় তত্ত্ব, সমালোচকদের সমালোচনার বিষয়--- যা লাতিনের সাহিত্য হয়েছে, কেননা উত্তর-আধুনিক তত্ত্ব উদ্ভবের আগেই এই সাহিত্য রচিত হয়েছে, লাতিনের বাস্তবতাই সেখনকার সাহিত্যিকদের এই ধারার রচনা লিখতে সহায়তা করেছে। আর উত্তর-আধুনিকদের মনে হয়েছে, এই ধারার রচনা পোস্টমডার্ন তাই আত্মসাৎ করেছে।
তথ্যসূত্রঃ [বাস্তবের কুহক কুহকের বাস্তব, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়]
[পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প, মোজাফ্‌ফর হোসেন]

জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ

'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দ...