সমালোচক কবির মুকুল প্রদীপ-এর দেয়াল
আমি একজন সাহিত্যের পাঠক মাত্র; ভালোবাসা থেকে তাই প্রিয় লেখক কবিদের বই নিয়ে পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখার চেষ্টা করে থাকি। ফলত ভাবলাম, এটা বরং সকলের সাথে শেয়ার করা যাক, তাই এই ব্লগের প্রয়াস_আশা রাখি সকলেই পাশে থাকবেন।
রবিবার, ২৩ মে, ২০২১
জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ
'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দিয়ে যাবার সময়, এক প্রখর যথাযথ কালপঞ্জি, যেটা মনে হয় তাঁর [যথাযথ হবার দাবি সত্ত্বেও] , কল্পনার এক লাগামছেঁড়া তুলকালাম অভিযান। তিনি বর্ণনা করেছেন তিনি নাকি এমন শুয়োর দেখেছেন যাদের নাভিকুণ্ডলি ছিল তাদের পিঠে [পেটে নয়] নাকি দেখেছেন এমন অনেক পাখির প্রজাতি যাদের পা নেই, মেয়েগুলো ডিম পেড়ে তা দিচ্ছে তাদের পুরুষগুলোর পিঠে, আর এমন কোনো-কোনো পাখি যাদের দেখতে অ্যালবাট্রসের মতো, দেখেছেন এমন পাখি যাদের জিভ নেই, যাদের চঞ্জুগুলো একেকটা শান-দেয়া ছুরির ফলা; পিপাফেত্তা বলেছেন তিনি দেখেছেন স্থগিতবৃদ্ধি সব প্রাণী_যাদের মুণ্ডু আর কানগুলো খচ্চরের মতো, শরীরটা উটের, পাগুলো হরিণীর, আর মৃদু হ্লেষাধ্বনিগুলো ঘোড়ার, তিনি বলেছেন পাতাগোনিয়ার প্রথম যে বাসিন্দার সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়েছিল তাকে তাঁরা একটি আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন, আর তার নিজের প্রতিরূপ দেখে নাকি আতঙ্কে উত্তেজিত সেই মানুষটির বুদ্ধিসুদ্ধি অমনিই লোপ পেয়ে গিয়েছিল।' [গ্রাবিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এর নোবেল-ভাষণের অংশবিশেষ]
সত্যি বলছি এবিষয়ে নতুন করে আর কিছু লেখার ইচ্ছা আমার অনুভূত হচ্ছিল না, কিন্তু বাংলাদেশের সমকালীন জাদুবাস্তব গল্প পাঠের পর মনে হ'ল- এই গল্প লেখকদের অধিকাংশই জাদুবাস্তববাদ ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝেননি [সকলে নয়] তাই আবার লিখতে উদ্যত হয়েছি। হ্যাঁ কল্পনা, জাদুবাস্তববাদ জটিল কিছু নয়; তুখোর কল্পনা, মার্কেজ যেটা বলেছেন তাঁর নোবেল-ভাষণে। কল্পনাই কেবল নয়, তার সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকে বাস্তব। জটিল মনে হচ্ছে? এত জটিল করে ভাববার কোন কারণ নেই। কল্পনা কী! এটা নিয়ে চিন্তায় আছেন? নাহ্ চিন্তার কোনো কারণ নেই। কল্পনা হচ্ছে সেই; ঘটনাটা মনে আছে? আরে, ওই যে এক ভদ্রমহিলাকে ছেলেধরা ভেবে পিটিয়ে মারল_পরে জানতে পারলাম ওই ভদ্রমহিলা আসলে তার বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিল। মনে পড়েছে? ওই যারা পিটিয়ে মারল, তারা কি ভেবে পিটিয়ে মারল মহিলাকে? ছেলেধরা? কিন্তু মহিলাতো তা নয়! ওরা ভেবে নিয়েছিল, ওদের মনে হয়েছিল। এটাই কল্পনা। বিষয়টা এমন যে, লাতিন আমেরিকায় যে জাদুবাস্তববাদের উদ্ভব হয়েছিল তা মূলত এমন কিছু বিস্মৃত মানুষের কল্পনা যারা মূর্খ, দাস।
দূরে পরে যাচ্ছি, আগে বাংলার সংস্কৃতি ও পুরাণ কল্পনার দিকে তাকানো যাক। রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, আরব্যরজনী কোথায় নেই এই কল্পনা? ব্যক্তিগতভাবে আমি ছোট থেকেই একটা ঘটনা জেনে বড় হয়েছি যে, রবিঠাকুর নজরুলের কবিতা চুরি করে নোবেল পেয়েছেন; অনেক পরে যখন সাহিত্য নিয়ে একটুআধটু ঘাটাঘাটি করছি তখন জানতে পারলাম_নজরুলের যখন তের বছর বয়স তখন কবিগুরু নোবেল পেয়েছেন! এটা কি জাদুবাস্তববাদ নয়? হ্যাঁ, এমন বহু উদাহরণ আপনি আপনার আশেপাশে চোখখুলে তাকালেই দেখতে পাবেন, যা বাস্তব নয়, কল্পনা, অথচ এমনভাবে বাস্তবের সাথে মিশে আছে যে বাস্তব থেকে তাকে আর আলাদা করা সম্ভব নয়। একেই বলে জাদুবাস্তববাদ। কোনো এক দুদে-সমালোচক একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লিখেছেন, জাদুবাস্তববাদ বলে পৃথিবীতে কিছুই নেই; অনেক যুক্তিটুক্তি দেখিয়ে সেই মত প্রতিষ্ঠা করতেও চেয়েছেন। আমি বলি, তবে আছে কী? কি এমন ঈশী গ্রন্থ আপনি পড়লেন যার বক্তব্য নির্ভুল! আমাদেরও দিয়েন পড়বো এবং নির্ভুল বাণী আওড়াবো। কোনো বাস্তববাদী তাত্ত্বিক আজও পর্যন্ত বাস্তবের কোনো সংজ্ঞা দাঁড় করতে পাড়ল না, সেখানে আপনি তো বিস্ময়, বাংলা সাহিত্যের!
বলে রাখা ভালো, লেখকদের তার অতীত জানতে হয়, জানতে হয় তার বাপ-দাদা থেকে শুরু করে চোদ্দপুরুষের সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা থাকতে হয় সেগুলোকে যাচাইবাছাই করে গ্রহণ-বর্জন করার। বাস্তবের কোনো সংজ্ঞা না জেনেই বাস্তবের সংজ্ঞা নির্ধারণ; তাই তো ঘটে বসে এমন বিপর্যয়। বাস্তব তবে কী? খুব সহজ এই প্রশ্ন, আমরা যাকে বাস্তব মনে করি। মনে করুন পৃথিবীর ইতিহাস ষাট লক্ষ বছরের, কিন্তু মানুষের সভ্যতা? ইহুদি মাইথলজি অনুযায়ী দুহাজার বছর, বাইবেল পনের শ বছর, কোরআন বার শ বছর, গীতা-মহাভারত-রামায়ণ এরই আশেপাশের সময়ের। এই তো? আমি এই টেক্সট লিখছি ওয়ার্ড ফাইলে, আমার বাপ লিখেছে তাল পাতায়; আমার বাবার বাস্তবতা তাল পাতা, আমার কম্পিউটার। তাল পাতার বাস্তবতা এখন কেবল স্মৃতি, আগামীতে কম্পিউটার স্মৃতি হয়ে যাবে। বাস্তবত তাৎক্ষণিক, বাস্তবতা স্মৃতি, বাস্তবতা কল্পনা কারণ মানুষ স্মৃতি কল্পনা করে; এই বাস্তবতা কোনো গড-ঈশ্বর-আল্লাহ এভাবে সাজিয়ে রাখেননি, গড়েছে মানুষ। যার কোনো নিশ্চয়তা নেই, আপেক্ষিক। পৃথিবীতে মানুষের বাস্তবতা সবটাই বানোয়াট, আপেক্ষিক। এটা কি জাদুবাস্তববাদ নয়?
কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল বোধহয়, নাকি একেবারে তা নয়! আলেহ কার্পেন্তিয়র, একজন কুবান লেখক মার্কেস যাঁকে গুরু মানতেন__কারণ লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদ তাঁর হাতেই সূচনা হয়। কুবার ইতিহাস আপনারা কমবেশি সকলেই জানেন, বিভিন্ন উপনিবেশের কারণে যার বাস্তবতা একেবারে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, স্পেইন, ফ্রান্স, পর্তুগিস, ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়ান ও আফ্রিকান কালো মানুষের সংস্কৃতি যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কোনটা তবে কুবান সংস্কৃতি? এমন প্রশ্নে কার্পেন্তিয়র মনে করতেন, নিগ্রো ও ইন্ডিয়ানদের বাদ দিয়ে সেটা অবশ্যই সম্ভব নয়। তাই তিনি তারই সন্ধান করলেন তাঁর উপন্যাস 'এই মর্তের রাজত্বে'_ তিনি যেটা করলেন একজন নিগ্রো ক্রীতদাসের বয়ানে, যার নাম তি-নোয়েল; আফ্রিকা থেকে যাকে কিনে আনা হয়েছে। সে মূর্খ কিন্তু তার আছে কল্পনাশক্তি, আছে আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা সংস্কৃতি যা স্মৃতিতে বিস্মৃতপ্রায়। উল্লেখ্য হুয়ান রুলফো, তিনিও একজন লাতিন আমেরিকান লেখক, এই লেখককেও মার্কেজ গুরু মানতেন; তাঁর একটি ছোটগল্পে এমনই এক বিস্মৃতপ্রায় ঘটানার বর্ণনা করেছিলেন। বুড়ো এস্তেবান যাকে তার মনিবকে খুন করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয় কিন্তু যখন তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় আসে তখন তিনি মনে করতে পারেন না, আসলেই তিনি খুনটা করেছেন কিনা অথবা করলেও করতে পারেন কিংবা না করলেও তার সেটা করা উচিত ছিল।
প্রবন্ধ কী লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদের মতোই ঝাপসা হয়ে গেল? ঘাবড়াবেন না, তেমনটা হওয়ার আশংকা এখানে একেবারেই ক্ষীণ। কারণ কার্পেন্তিয়র তাঁর 'এই মর্তের রাজত্বে' তি-নোয়েলকে দিয়ে যা বর্ণনা করান, সেখানে আমরা দেখতে পাই একজন নিগ্রো ক্রীতদাস যার একহাত কেটে নিয়েছে তার সাদা প্রভুরা, যার নাম মাকান্দাল। দাস হিসেবে যখন তার আর কোনো মূল্য নেই তখন সে পালিয়ে চলে যায় জঙ্গলে। এখান থেকেই শুরু হয় তুলকালাম কল্পনার বিস্তার, নিগ্রো-রা ভাবতে থাকে মাকান্দালই তাদের রক্ষাকর্তা কারণ তার ওপর এখন ভর করেছে দেবতা, সে নানান রূপ ধরতে পারে--নিশিপোকা, সবুজ গিরগিটি, খুরওয়ালা কোনো জন্ত্রু যার মাথায় দাউদাউ করে শিং; গলে যেতে পারে কোনো চাবকি ফোঁকর দিয়ে ইত্যাদি। হ্যাঁ এমটাই তারা কল্পনা করে, কেননা তারা দাস, মূর্খ__দিনভর প্রভুর বাড়িতে খেটে অবসরে_স্মৃতি ঘেটে ঘেটে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদাই তাদের জীবন। তারা বিশ্বাস করে দাস জীবন থেকে তাদের উদ্ধার করতে পারে একমাত্র কোনো অলৌকিক শক্তিই। এভাবেই বাস্তবের সাথে কল্পনা মিশে গিয়ে জন্ম নেয় অন্য এক বাস্তবের, জাদুবাস্তববাদের। যেমটা ঘটেছে রুলফোর গল্পে, যে বুড়ো এস্তেবান দিনরাত কল্পনা করে তার প্রভুকে হত্যা করার, স্বপ্নে সেটা সে করেছেও বহুবার; এখন যখন তার আর কাউকেই হত্যা করার ক্ষমতা নেই_তখন কিনা তাকে তার মনিবকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হল!
তাহলে সে বুঝতে পারবে কিকরে যে সে হত্যা করেছে কি-না? বাস্তব আর কল্পনা দুই তো তার জীবনে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে!
পরিষ্কার হ'ল না? নাহোক সমস্যা নেই। মনে করুন আপনি হ্যাঁ আপনিই, মৃত্যুশয্যারত আপনার মাকে কথা দিয়েছেন যে; আপনার বাবা, যিনি আপনার মায়ের সকল সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তাড়িয়ে দিয়েছে_ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর হারানো ঐশর্য উদ্ধার করবেন এবং আপনার মা মারা গেলেন। অতঃপর মায়ের কথা রাখতে একদিন পিতার উদ্দেশে রওনা হলেন, বাবার গ্রামের দিকে; যে গ্রাম আপনি চেনেন না, কোনো দিন সেখানে আপনি যাননি। পথে আপনি দেখতে পেলেন ধূ ধূ মরুভূমি আর ভগ্নস্তূপ; যাদের সাথে আপনার পথে দেখা হচ্ছে তাদের কথা অস্পষ্ট ভাসাভাসা। এভাবে যখন আপনি আপনার বাবার গ্রামে গিয়ে পৌঁছলেন, দেখলেন সেখানে কোন গ্রাম নেই, আছে কেবল পোড়োজমি আর ভগ্নস্তূপ; মানুষ সকলেই মৃত। রাত হলেই সব জেগে ওঠে, বাতাসে ফিসফাস কথা শোনা যায়, খুরে শব্দ তুলে ছুটে যায় ঘোড়া। যে বৃদ্ধার ভাঙাচোরা ঘরে আপনি গিয়ে উঠেছেন, তিনি আপনার আসার কথা আগে থেকেই জানে; তার কাছে জল চাইলে একটি ভাঙা মাটির পাত্র আপনাকে দেয়া হয় যার ভেতর জলের কোনো অস্তিত্ব নেই। পরক্ষণেই জানতে পারছেন বৃদ্ধাও মরে ভূত হয়ে গেছে বহু আগেই। পর্যায়ক্রমে জানতে পারছেন আপনার পিতাও তারই অন্য আর এক সন্তানের হাতে খুন হয়েছেন, যখন কিনা তিনি গ্রামের সকলকে না খাইয়ে মারার পরিকল্পনা করছিল। মোটাদাগে আপনি একটি ভূতের গ্রামে এসে আটকে পড়েছেন, যেখান থেকে বোরোনোর কোনো পথ আপনার জানা নেই, আর অতীতের কোনো গলিঘুপচির ভেতর হাতরে ফিরছেন অস্তিত্ব আর আমরা জানতে পারছি আপনিও কবেই মরে ভূত হয়ে গেছেন।
হুয়ান রুলফো তাঁর একমাত্র উপন্যাস পেদ্রো পারামোতে এমনই এক গল্প ফেঁদেছিলেন। আসলে তিনি খুলে দেখাতে চাইছিলেন মেহিকোর অতীত ও বর্তমানের এমন এক জটিল অবস্থা যার ভেতর মানুষ যেন কেউ বেঁচে নেই, দীর্ঘ উপনিবেশ ও স্বৈরাচারী শাসকদের শোষণের কারণে যাদের অস্তিত্ব ঝাপসা ও অস্পষ্ট হয়ে গেছে। গ্রাবিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর নোবেলজয়ী উপন্যাস নিসংগতার এক শ বছর-এও অতীত-বর্তমান ঘুলিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক মোজাফ্ফর হোসেনের উপন্যাস তিমিরযাত্রাতেও অতীত অনুসন্ধানের প্রয়াস পেয়েছে। এর পরেও যদি বুঝতে অসুবিধা হয়, তবে মনে করুন আপনিই আপনার অস্তিত্ব অনুসন্ধানে বেড়িয়েছেন; কোথায় যাবেন? অতীতে? সেখানে তো কেউ বেঁচে নেই, মরে ভূত হয়ে গেছে। ভূতে আপনার বিশ্বাস নেই? আমিও বিশ্বাস করি না, এগুলো মানুষের কল্পনাপ্রসূত। যেমন স্বর্গ-নরক ইত্যাদি, কিন্তু আপনার আমার বিশ্বাসকে তো সবাই পরোয়া করে না! বাংলাদেশের নিরানব্বই শতাংশ মানুষ এমন কল্পনার ভেতর জীবনযাপন করে_এটা কি জাদুবাস্তববাদ নয়? নাকি সেই মানুষগুলো বাস্তবের অংশ নয়? মোটাদাগে এই বিশ্বে কল্পনা আর বাস্তব এমনভাবে মিশে আছে যাকে আর আলাদা করা সম্ভব নয়_এবং সেটাই হচ্ছে বাস্তব পক্ষান্তরে জাদুবাস্তব; বাস্তব বলে কিছু নেই কিংবা আছে যার কোনো সংজ্ঞা নেই।
শনিবার, ২২ মে, ২০২১
উত্তরাধুনিক রেস্তোরাঁয় মানুষের মাংস
ভুল বুঝবেন না! আসলে বলতে চেয়েছি, উত্তরাধুনিককালে মানুষের মাংস খাওয়ার ধরন কিংবা রূপান্তরটা কেমন হয়েছে। আদৌ কী মানুষ মানুষের মাংস খায়? গল্পগ্রন্থ ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’র লেখক মোজাফ্ফর হোসেন একটি সাক্ষাৎকারে এর উত্তর দিয়েছেন। সত্যি বলতে কি, উত্তরটা আমার মনের মতো হয়েছে অথবা ভাবতে পারেন— আমিও তেমনই ভেবেছিলাম বইটি পড়ে। মোটাদাগে মনে করি, মানুষ মানুষের মাংস খায়, একটি রাষ্ট্রের গোটা সিস্টেমটাই বেঁচে থাকে মানুষের মাংস খেয়ে। এটা এলিগরিক্যাল। জটিল গোলকধাঁধা। গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেন যেটা সুনিপূণভাবে পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি গল্প বলেন একটু ভিন্নভাবে, যেটা বাংলা সাহিত্যে ইতোমধ্যে জায়গা পাকা করে নিয়েছে। এইসব গতানুগতিক কথাবার্তা বলে সেটা প্রকাশ করা সম্ভব নয় বরং উত্তরাধুনিক কিংবা জাদুবাস্তববাদের আলোকে কিছুটা বিশ্লেষণ সম্ভব হলেও হতে পারে।
একুশটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থটির প্রায় সবকটি গল্পের ভেতরেই প্যারানাইয়া কিংবা ব্লাক হিউমর অথবা আয়রনির ব্যবহার লক্ষণীয়। বিষয়টা এমন যে আয়রনির মতো কৌতুকপূর্ণ ব্যাপারের সাথে ব্লাক হিউমর অথবা প্যারানাইয়ার মতো সিরিয়াস বিষয়ের সংমিশ্রণ। যেমন, ‘একটি খুনের স্বীকারোক্তি’ গল্পে লেখক দেখিয়েছেন— খুনির দুটো হাতই নাই; মুক্তিযুদ্ধের সময় যার দুটো হাতই কেটে নিয়েছে পাকিস্তানি রাজাকার। এখন তাকেই কিনা আসামি করা হয়েছে এলাকার বিত্তবান চেয়ারম্যানকে খুনের অপরাধে। এই গল্পের ভেতর আয়রনি আছে। কিন্তু পাঠক যতই গল্পটির ভেতরে লুকানো আরও যে গল্পগুলো আছে সেগুলোর গভীরে প্রবেশ করবে, ততই সিরিয়াস হয়ে উঠবে— গল্পটি শেষতক উন্মোচন করবে ক্ষমতা ও তার অপব্যবহার এবং অবক্ষয়। গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠকের লাতিন আমেরিকার লেখক হুয়ান রুলফোর ‘বুড়ো এস্তেবান’ গল্পটির কথা মনে পড়ে যেতে পারে। এই গল্পগ্রন্থে প্রতিটি গল্পের ভেতরই রয়েছে বীভৎসতা কিংবা বীভৎস রস, যেটা প্যারানাইয়ার অনুরূপ।
বলে নেয়া ভালো, গল্পগ্রন্থটি পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হতে পারে— লেখক ইতিহাস সচেতন। মনে হতে পারে, গল্পের ছলে লেখক যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস লিখছেন। লিখছেন কিছু সিজোফ্ফেনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের বয়ানে। তাই তারা অবলীলায় ধর্ষণকে উৎযাপন করতে পারেন, মানুষের মাংস খেতে খেতে হিউম্যান রাইটস নিয়ে কথা বলতে পারেন, স্মৃতিভ্রষ্টের মতো ঠিকানাহীন ঠিকানায় চিঠি লিখতে পারেন; এমনকি খুন হয়ে গিয়েও আফসোস করতে পারেন এই বলে যে, এমনভাবে খুন হওয়া অর্থহীন— যে খুনের খবর ভাইরাল হওয়ার মতো নয়! গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাসটা যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে, এই উপন্যাসের একটি পর্বে দেখানো হয় মাকোন্দ গ্রামের সকলেই স্মৃতিভ্রষ্ট রোগে আক্রান্ত হন এবং তারা ভুলে যেতে থাকেন পূর্বের সকল স্মৃতি, তাই তারা গাভীর গায়ে লিখে রাখেন: ‘এটা গাভী, দুধ দেয়।’
মোজাফ্ফর হোসেন প্রণীত ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’ গল্পগ্রন্থের চরিত্রগুলোও তেমন স্মৃতিভ্রষ্টের মতো আচরণ করে। আমার একটি প্রবন্ধে বলেছিলাম: বাঙালিরা আসলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অর্থ এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। তারা হিন্দু, মুসলমানের চক্রব্যূহের ভেতরেই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছেন, ফলত সমস্যা হচ্ছে পূর্ববঙ্গে যারা নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তাদের সংস্কৃতি বলে আর কিছু থাকে না, আমদানিকৃত কিছু খেজুরে মালমসলা নিয়ে তারা উন্মাদনা প্রকাশ করেন, যা হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িকতার নামান্তর।
এই জাতি মূলত স্মৃতিভ্রষ্টেরই অনুরূপ। যেটা গল্পগ্রন্থের ‘স্পাই’ শিরোনামের গল্পটিতে উঠে এসেছে। গল্পটি বলা হয়েছে একটি শিশুর বয়ানে— নিঃস্পৃহ ভঙ্গিতে। মূলত যাত্রাপালা, নাচ-গান-মেলার মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো ধর্মীয় এজেন্ডা দিয়ে বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলায় সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ফলে নির্মমতাই হয়ে উঠেছে মানুষের উৎসবের বিষয়। তাই নিরীহকে নিপীড়ন করে এরা আনন্দ পায়, খুন হতে দেখলে আনন্দ করে সেলফি তোলে, গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মারে অসহায় মহিলাকে। শিশু বলৎকার অথবা ধর্ষণের কোনো বিচার হয় না।
‘শেষ মাথাটি কাটা পড়ার আগে’ গল্পটিতে মোজাফ্ফর দেখিয়েছেন, মাথাহীন মানুষের রাষ্ট্রে কীভাবে মানবতা ভেঙে পড়েছে, সৃষ্টি হয়েছে বীভৎস বিশৃঙ্খলা। কাফকার ‘রূপান্তর’ গল্পটির শুরুর মতো এই গল্পটিরও প্রথম বাক্য হচ্ছে: ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা যেমন দেখছেন সে রূপান্তরিত হয়েছে একটি পোকায়, তেমনই মোজাফ্ফর দেখছেন কেবল তারই মাথা আছে, আর কারো মাথা নেই! মোজাফ্ফর হোসেনের গল্পগুলো ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধেও এক জোরালো প্রতিবাদ। তিনি ‘মসজিদ’ শিরোনামের গল্পটিতে দেখিয়েছেন ক্ষমতাবানেরা কীভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ নিরীহ জনগণকে শোষণ-নিপীড়ন করে।
মোজাফ্ফরের গল্পের ভাষা সমসাময়িক মানুষের মুখের ভাষা। একারণে তার গল্পপাঠ হয়ে ওঠে সমকাল পাঠ, তিনি সময়কে খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। তার গল্পে পোস্টমডার্ন এবং জাদুবাস্তববাদের সফল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। উত্তরাধুনিক তত্ত্বের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: গল্পের চরিত্ররা মাঝে মাঝে সরাসরি লেখকের সাথে কথা বলেন এবং গল্পের বাঁক বদল করে দেন, লেখকের আর সেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে না, ফলে একটা গল্পের ভেতর ঢুকে পড়ে অন্য আর একটা গল্প। বইয়ের ‘বেকার জীবনের অপঠিত গল্প’ শিরোনামের গল্পটিতে যেটা পাঠক উপভোগ করবেন।
ক্ষেত্রবিশেষে মোজাফ্ফরের গল্প পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে তিনি সংবাদ প্রতিবেদন পড়ছেন; এটাও পোস্টমডার্ন জনরা। ‘খুনের সংবাদ ধরাতে’ তেমনি একটি গল্প। এই ধরনের গল্পগুলো কিছুটা গল্পহীন গল্পের মতো, এধরনের গল্পে লেখকের আবেগটা বোঝা যায় না, এমন নিঃস্পৃহ ভঙ্গিতে গল্পগুলো বলার একটা বিশেষ সুবিধা হচ্ছে, খুব সহজেই অনেক কথা বলে দেয়া যায়, আর পাঠক নিজের মতো করে গল্পের ভেতরের গল্পগুলো বিনির্মাণ করার স্পেস পায়।
আর জাদুবাস্তববাদ হচ্ছে লাতিন আমেরিকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি শিল্প-মতবাদ, যেটাকে আসলে মতবাদ কিংবা তত্ত্ব বলাও যায় না। জাদুবাস্তবাদ সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাস্তবতার ভেতর জাদুকে প্রতিষ্ঠা করা, জাদুর ভেতর বাস্তব নয়। জাদুর ভেতর বাস্তব প্রতিষ্ঠাকে বলে ফ্যান্টাসি। জাদুবাস্তবতায় অবাস্তব ঘটনাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয় প্রয়োজনীয় বর্ণনা দিয়ে। যেটা পাঠক উপভোগ করবেন ‘পুনরুত্থান’, ‘শেষ মাথাটি কাটা পড়ার আগে’ প্রভৃতি গল্পে। মার্কেসের ‘বিশাল ডানাওয়ালা থুরথুরে বুড়ো’র মতো এই গল্পেও চরিত্রকে ঘিরে জমে ওঠে মজমা, আর পাঠক চিনে নেন মানুষ, মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং সমাজ বাস্তবতা।
সত্যি বলতে কি, এতো সহজ করে লেখক মোজাফ্ফর হোসেন কিংবা তার গল্পগুলোর বর্ণনা দেয়া প্রায় অসম্ভব, আমি সেই ভুলে পা দিচ্ছিও না। সুতরাং পাঠক ধরেই নিতে পারেন, লেখাটা অসম্পূর্ণ। আর যে বিষয়টি পাঠককে বারবার নাড়া দেবে সেটা হচ্ছে, পূর্বের সাহিত্য। মোজাফ্ফর হোসেনের গল্পে পূর্বের বিভিন্ন সাহিত্যের অংশ যত্রতত্র হানা দেবে। সেটার ঝোঁকটা লাতিনের সাহিত্যের দিকেই বেশি, ফলে এই লেখক যে লাতিন সাহিত্যদ্বারা প্রভাবিত, পাঠকের সেটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
মোজাফ্ফরের গল্পে তাই জাদুবাস্তববাদ, পরাবাস্তব, অধিবাস্তব, সর্বোপরি পোস্টমডার্ন ভীষণ সাবলীলভাবে একাকার হয়ে যায়। তিনি দক্ষ খেলুড়ের মতো তার গল্পের চরিত্রদের মানুষের কাটা মাথা দিয়ে ফুটবল খেলান। ‘যে জীবন ফুটবলের’ গল্পটিতে উঠে আসে সমাজের এমনকিছু চরিত্র যাদের মূলত ভবিষ্যৎ বলা হয়, মানে চরিত্রগুলো কিশোর। কিন্তু তারা এতটাই নেশাগ্রস্থ যে ফুটবল খেলার জন্য স্বজনদের গলা কাটতে শুরু করে। কিছুটা ধর্মীয় মৌলবাদীদের মতো। তাছাড়া গল্পটি পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে এই খেলায় যেন ক্ষমতাসীন লোকেরা সকলেই ভীষণ দক্ষ।
সর্বোপরি বলা যায়, ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’ বইটিতে লেখক মোজাফ্ফর হোসেন সমাজের সেইসব অন্ধকারের ভেতর আলো ফেলেছেন যেটা প্রায় সকলেই অবগত অথচ কারো কিছুই বলার ক্ষমতা বা সাহস নেই। কেননা ডিজিটাল সুরক্ষা আইন! যে আইনের ফাঁদে ফেলে নিরীহকেও অপরাধী হিসেবে জেলে ঢোকানো যায়। বাক-স্বাধীনতা নিয়ে এই বইয়েও চমৎকার একটি গল্প আছে, কিন্তু সবকিছুই যদি আপনাদের সামনে খুলে-টুলে দেখিয়ে দিই তাহলে আপনারা একটি অসাধারণ বই পড়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে, আপনারা বইটি কিনুন এবং পড়ুন আর দুর্দান্ত একটি বই পড়ার আনন্দ উপভোগ করুন।
আলোচক: কবির মুকুল প্রদীপ (কবি-প্রাবন্ধিক-নাট্যকর্মী ও নৃত্যশিল্পী)
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০
বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির একালসেকাল
মানুষ যে মানবিক গুণাবলি নিজের ওপর আরোপ করেছে তার মূলে রয়েছে ভাষা, ভাষা ছাড়া মানুষকে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীর থেকে আলাদা করার কোনো বাস্তবতা নেই। এইটা একটা বহু চর্বিত বিষয়, কিন্তু ভাষা যেহেতু প্রতিমুহূর্তে বিনির্মিত হয়, ভাষাকে বিনির্মাণ করার ক্ষমতা যেহেতু মানুষের ভ্রূণাবস্থাতেই মস্তিষ্কের কোষ ক্রোমোজমে প্রতীকী রূপে অবস্থান করে, ফলত প্রতিটি মানব সত্তা সেই ভাষাসৃষ্ট প্রতীকগুলোকে নিজ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব ভাষার জগত, প্রকাশ করেন অনুভূতি, গড়ে তোলেন সামাজিক পরিচিতি। সহজ করে বলতে হলে, প্লেটোর অনুকরণ তত্ত্ব ও হাইডেগার কথিত মৌল এবং পতিতসত্তা থেকে কিছু ঋণ নিতে হয়। দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, কবি-শিল্পীরা ঈশ্বর সৃষ্ট প্রকৃতির অনুকরণ করেন ফলে কবিদের বাস্তবতা তৃতীয় বাস্তবতা যার সত্যাসত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্লেটো। এরিস্টেটল এই অনুকরণকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলেই মনে করতেন। মানুষ মূলত ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই প্রকৃতি ও পরিপার্শ্ব থেকে অনুকরণ করে, এবং এটাই স্বাভাবিক। এই অনুকরণ অথবা যুগ্মবৈপরীত্য হাইডেগার কথিত দুটো সত্তায় ভাগ হয়ে যায়, যাকে তিনি বলেছেন মৌল ও পতিত অর্থাৎ ভালো ও মন্দ।
এই ভালো ও মন্দ দেরিদার বিনির্মাণ তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লষণ করলে সবটাই ভেঙে পড়বে, মানে আপেক্ষিক। তথাপি আমরা ভালো বলতে এখানে সেটাই বুঝবো যেটা পৃথিবী ও প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর; পৃথিবী ও প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন হলে বুঝবো মন্দ। মানুষ তার পরিপার্শ্বিক তথাকথিত ভালো ও মন্দকে অনুকরণ করে গড়ে তোলে যুগ্মবৈপরীত্য; ঘোষণা করে মৌল এবং পতিত সত্য-মিথ্যার পরিচিতি। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, ভাষাকে কেন্দ্র করে মুনুষ্য সমাজে যে ভালোমন্দ, নীতিনৈতিকতাবোধ পতিষ্ঠা হয়েছিল তার মূলে রয়েছে ধর্ম। ধর্মই আমাদের শিখিয়েছে এটা করা উচিত এবং এটা অনুচিত। যেহেতু ধর্মগুলো সব পুরুষতান্ত্রিক তাই পরিবার কেন্দ্রিক যে সমাজবাস্তবতা তাকে আমরা পিতা অথবা প্রভুত্ববাদী বলতে পারি। জাক লাকাঁ তাই এই প্রভুত্ববাদী সমাজে ভাষাদ্বারা নির্মিত প্রতীকগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে যে, 'বাবা-মা, খালা-খালু, ভাই-বোন এ ধরনের নামকরণের অর্থই হলো একজন ব্যক্তি-একককে বুঝিয়ে দেয়া, কার সাথে যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে এবং কে যৌন-সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।'
দূর অতীতে শিকারী সংগ্রাহক যুগে এই হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির ভেতর সম্পদ কুক্ষিগত করার ধারণা জন্মে নারীকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ গোষ্ঠীবদ্ধোভাবে জীবনযাপন করা মানুষের একজন গোষ্ঠীপতি থাকতো, তিনি ক্ষমতাবান, শিকারে দক্ষ হতেন। ফলত এই পতির ভোগ্যপণ্য হিসেবে অধিকারে থাকতো একাধিক নারী; কালক্রমে এই পতির পতন হতো দলেরই কোনো অন্য ক্ষমতাবান পুরুষের দ্বারা এবং অধিকৃত নারীদের সাথে দখল নিতেন প্রভুর অবস্থান। এভাবেই ধীরে ধীরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় পিতা কেন্দ্রিক সমাজ বাস্তবতা এবং পিতার দ্বারা আরোপ হয় ন্যায়নীতি বোধ, তারই প্রত্ন আজও আমাদের অবচেতনে প্রবহমান। ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব মূলত এইসব ন্যায়নীতি বোধের দাসত্বে মানব মনে যে অবদমন তাকে কেন্দ্র করেই। কারণ এটা ভালো, ওটা মন্দ, এটা আমার, ওটা তোমার মতো ন্যায়নীতিবোধ মানব মনে জন্ম দিয়েছে একধরনের যৌন-অতৃপ্তি, যা ভাষাপ্রতীকের মাধ্যমে সুপ্তাবস্থায় রক্ষিত আছে অচেতনে। ফ্রয়েড যাকে বলেছেন ইডিপাস কম্পেলেক্স, ইলেক্টা কম্পেলেক্স, লিঙ্গকর্তনভীতি, লিঙ্গহীনতা জনিত ভয়। ফ্রয়েডের বক্তব্যানুযায়ী মানব মনে এই অতৃপ্ত বাসনা ঘুমন্তবস্থায় স্বপ্নপ্রতীক রূপে ধরা দেয়, যে স্বপ্ন খ-িত এবং এলোমেলো অধিবিদ্যাজাত। এই অবদমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে অর্থাৎ অবচেতন দ্বারা সচেতন সত্তা পরাজিত হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা হয়। ফ্রয়েডের এই স্বপ্নপ্রতীকের বিশ্লেষণ করেই মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের চিকিৎসায় এক অভিনব পদ্ধতির আবির্ভাব হয় যা মূলত ভাষাদ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে।
ফ্রয়েড পরবর্তী ভাষা দর্শনে আজ অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু ফ্রয়েডকে পুরোপুরি বাতিল করে নয় বরং সকলেই ফ্রয়েডের কাছে ঋণস্বীকার করেছেন। এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় সেসব নয়, তথাপি কাব্য-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার আগে এইসব চর্বিতচর্বণ আর একবার চাবিয়ে নিলাম। বাংলা সাহিত্যে মূলত এইসব অবদমনকে কেন্দ্র করেই, তবে হাইডেগার কথিত পতিত ও মৌল দুটো সত্তারই প্রকাশ দৃশ্যমান। যথা চর্যাপদের কবিদের দ্বারা রচিত পদকে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা সম্ভব। আমরা চর্যায় যে পদ পড়েছি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায় যাকে বলে সান্ধ্যভাষায় রচিত পদ, কতক বোঝা যায়, কতক বোঝা যায় না; মানে একটা আড়াল তৈরি করা হয়েছে, রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তখনকার বাস্তবতায় সবকিছু সোজাসাপটাভাবে বলার অধিকার ছিলো না, ক্ষমতাদ্বারা আরোপিত আইন সমাজে যে বাস্তবতার সত্যমিথ্যা গড়ে তুলেছিলো সেখানে খোলাখুলিভাবে সবকিছু বলা ছিলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধর্মকেন্দ্রিক বাস্তবতায় যে আইন ঈশ্বর প্রদত্ত, উপমহাদেশের ধর্মগ্রন্থগুলোতে এমন দৃষ্টান্ত ভুঁড়িভুঁড়ি। যথা সংস্কৃত বৃহন্নলা শব্দটির ব্যবহার আমরা মহাভারতে পাই, সামান্য লৈঙ্গিক ত্রুটির কারণে মানুষ হয়ে, মানুষের ভেতরে থেকেও তাঁদের ওপর এই অধিবিদ্যাজাত শব্দটিকে আরোপ করার ফলে আজও হিজরেদের দুর্বিষহ জীবন আমরা স্বাভাবিক মনে করি, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি হচ্ছে আমাদের কোষ ক্রোমোজমে এইসব প্রভুত্ববাদী শব্দদ্বারা আরোপিত বাস্তবতা এখন রক্ষিত আছে, ভাষাপ্রতীকের মাধ্যমে। একারণে চর্যাপদ মৌলিক হলেও ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্য আজ আর ততটা মৌলিক নয় ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে।
শব্দ যেহেতু কোনো ধ্রুব সত্যমিথ্যার প্রকাশ করে না তাই ভাষা দার্শনিক দেরিদা একে মুক্তক্রিয়া এবং বিনির্মাণযোগ্য বলেছেন; তিনি ভাষা থেকে অধিবিদ্যাজাত সংশয় দূর করতেও চেয়েছিলেন। আমরা আবার একটু পেছনে ফিরে দেখে নিতে পারি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অধিবিদ্যাজাত ভাষার ব্যবহার করে কীভাবে আপামর জনগণকে শোষণ করুছে ক্ষমতাসীনেরা। বাংলায় ব্রাহ্মণবাদী বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার পর, তারা(ব্রাহ্মণরা) বলতেন, 'কোনো ব্রাহ্মণ যদি কুকর্মে লিপ্ত থাকে কিংবা যদি অশিক্ষিতও হয়, তবুও তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে হবে।' কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করতেন, 'নীচু জাতে জন্ম হওয়া মানে হচ্ছে পূর্বজন্মের কোনো পাপের অভিশাপ, ফলত ইহজন্মে ব্রাহ্মণসেবায় তোমাদের পুনর্জন্মে ব্রাহ্মণঘরে জন্ম মিললেও মিলতে পারে।' ব্রাহ্মণারই তৎকালীন সমাজে জাতপাত-উচুনীচু-বর্ণ-গোত্রের ভেদাভেদ গড়ে তুলেছিল বাঙালি মানসে। বঙ্কিমী সাহিত্যে আমরা এই লক্ষণ দেখতে পাই, রবীন্দ্রসাহিত্যও একেবারে মুক্ত ছিলো না। আমরা যদি মধ্যযুগীয় প্রবাদ-প্রবচনগুলো পড়ি, তার ভেতরেও এইসব লক্ষণ খুঁজে পাবো। বাংলায় মুসলিম শাসকেরা আসার পর ধীরে ধীরে নিপীড়িত বাঙালিরা মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তারিত হতে থাকেন, পর্যায়ক্রমে সংখ্যাটা প্রায় সমান-সমান হয়ে দাঁড়ায়। ব্রাহ্মণবাদী বৈষম্যগুলো কালক্রমে সাম্প্রদায়িক রূপ লাভ করে, ফলত ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন দেশের সূচনা হয় কিন্তু পাকিস্তানদ্বারা চাপিয়ে দেয়া উর্দুভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে না বাঙালিরা, কেবল ধর্মই তাদের বেঁধে রাখতে ব্যর্থ হয়।
এর কারণ হচ্ছে বাঙালিরা যতই ডিভাইটেড হোক না কেন তাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা এবং প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। তথাপি যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দুই ধরনের সাহিত্য লক্ষ করি, যথা মুসলমান বাঙালি সাহিত্য এবং বাঙালি মুসলমান সাহিত্য। এই দুইশ্রেণির মানুষের মানসিক অবদমন বুঝতে হলে আমাদের আবার একটু প্রত্নতত্ত্বের দ্বারস্ত হতে হবে। প্রস্তর যুগে বাঙালিরা সাম্যবাদী ছিল, জাত-ধর্ম-বর্ণ জাতীয় সাম্প্রদায়িকতা আমাদের প্রস্তর যুগীয় পূর্বপুরুষদের ভেতর ছিল না; এমনটা ধারণা করা হয়। ব্রাহ্মণদের হাত ধরেই এই জাত-পাত জনিত ভেদাভেদ শুরু হয়, পরবর্তীতে ইসলাম শাসনামলে যে নব্য-ইসলামী গোষ্ঠীর জন্ম হয়; যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে তারা তাদের বাঙালি অস্তিত্ব অস্বীকার করে, আরবি-পার্শি-তুর্কি ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রধান্য দিতে শুরু করে, ফলত তাদের কাছে জাতীয়তার প্রশ্নে উত্তর আসে, 'আমরা মুসলমান বাঙালি।' এই মুসলমান বাঙালিগোষ্ঠীদের দ্বারা রচিত সাহিত্য মূলত সংস্কৃত ও হিন্দুত্ববাদী সাহিত্য বিরোধী। পক্ষান্তরে তারা বলেন, শব্দে যেহেতু সাম্প্রদায়িকতা নেই তাই বাংলাদেশি সাহিত্যকে কোলকাতা কেন্দ্রমুক্ত করতে হলে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে প্রাধান্য দিতে হবে, ফলত এই শ্রেণির কাব্যগ্রন্থের নাম হয়, বাদ মাগরিব, নুর নুর বলে চমকায় পাখি ইত্যাদি। দার্শনিক জাক লাকাঁর দর্শনানুযায়ী মানুষের অবচেতন হচ্ছে ভাষা-শৃঙ্খলে তৈরি, একারণে একটি মানুষ সবসময় ভাষার রূপক ও প্রতীক সৃষ্টির মাধ্যমে তার অবদমিত অবচেতনকে প্রকাশ করতে চায়। মুসলিম বাঙালিদের দ্বারা রচিত সাহিত্য তাই নৃতাত্বিক কারণেই হয়ে ওঠে হিন্দু বিদ্বেষী যেটা ব্রাত্য রাইসুর ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো পড়লেই বোঝা যায়।
বাঙালি মুসলমান অথবা বাঙালি পরিচয়ে যে সকল কবি-লেখকগণ বর্তমানে বাংলাদেশি সাহিত্যে অবদান রাখছেন, তারা মূলত বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা চায়। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যথা বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক মুজিব ইরম, তার কবিতায় আমরা দেখতে পাই প্রস্তর যুগীয় সাম্যবাদ ও বাঙালি সহজিয়া সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করার প্রয়াস, গল্পকার-অনুবাদক-প্রাবন্ধিক মোজাফ্ফর হোসেন তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন এই বলে যে, 'ছোট বেলায় আমরা, বন্ধুরা মিলে লাল পিপড়ে মারতাম-মানে লাল পিপড়ে হচ্ছে হিন্দু; কেন মারতাম জানি না।' তিনি এই সংস্কৃতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে এসেছেন? লড়াইটা কেমন ছিল? প্রশ্নে ফুটে ওঠে পরিবারতন্ত্রকে ভেঙে একটি সত্তার বৈশ্বিক হয়ে ওঠার গল্প। কবি সরদার ফারুকের কবিতায়ও আমরা এমন বাস্তবতা লক্ষ করি। বলে রাখা ভালো, এই প্রবন্ধে সাহিত্যের শিল্পগুণ বিচার হচ্ছে না, কেবল বাংলাদেশে সক্রিয় দুটো সাহিত্য ধারার তুলনামূলক আলোচনা হচ্ছে। ফলত শিল্পমাণ বিচার এখানে অযৌক্তিক। এই বাঙালি মুসলমান অথবা বাঙালি লেখকশ্রেণির বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে হিন্দুপ্রীতির? আসলেই কী তাই? এই প্রশ্নেরও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে। পুস্কর দাশগুপ্ত বলেছেন, 'অনেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, ভাষা, ধর্ম আচার-বিচার ইত্যাদি ব্যবধান পেরিয়ে সারা ভারতে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো সাধারণ চারিত্রিক লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য যদি থেকে থাকে তাহলে তা হল ভ-ামি। ভারতীয় (বাঙালি বলে আলাদা না করে) সমাজের সর্বস্তরে ভ-ামির অবাধ রাজত্ব আর ভ-ামি এই সনাতন দেশে সর্বধর্মসম্মত, সমস্ত স্মৃতি এবং নীতিশাস্ত্র অনুমোদিত। ধর্মবাক্য, নীতিবাক্যের আড়ালে চুরি, ফেরেব্বাজি করে যাও, ভেজাল দাও, কালো পয়সার পাহাড় বানাও,আড়াল থাকলেই হল। স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য, ব্যক্তিগত সুবিধা বা কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, খুন জখম, জাল জুয়াচুরি, কালোবাজারি সব করে যেতে পারো। তবে তারপর তুমি যদি ঘটা করে তেত্রিশ দেবতার পুজা দাও, হজ করে আসো, মন্দির, মসজিদ কি গির্জা বানাও তাহলেই সমাজ, জাতি, ধর্ম তোমাকে বাহবা দেবে, মাথায় তুলে নাচবে।' { দুশ্চিন্ত দুর্ভাবনা, কলিকাতা ১৯৯৫}
মোটাদাগে বাঙালি হচ্ছে ধর্মান্ধতার লেবাসে ন্যায়নীতিহীন। এর কারণ হল অস্তিত্ব সংকট; ব্রাহ্মণ্যবাদী জাত-পাত ভেদাভেদ, সামন্তবাদী নিপীড়ন, মুঘল-পাঠান-ইংরেজ শোষণ, দেশভাগ, স্বাধীন বাংলাদেশে কোথাও বাঙালি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে না। কেননা জাতি বিভ্রান্ত, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত লালন ফকিরের দুটো গানের ডায়রি পড়তে নিয়ে আর ফেরৎ দেয়নি, এটা মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে এই ভূখ-ে মুসলমান, মুসলমান বাঙালি কিংবা বাঙালি মুসলমানের আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কেবল বাঙালি সুতরাং মক্কা-মদিনায় শেকড় না খুঁজে, খুঁজতে হবে এই ভূখ-ে, যেখানে আমাদের দ্রাবিড় (অথবা আপনি যেটা মনে করেন) পূর্বপুরুষেরা কোনো কালে কেবল বাঙালি পরিচয়ে সাম্যবাদী ছিলেন। তাই মন্ত্র কিংবা ওয়াজ সুলভ সম্মোহন সৃষ্টি করে সাহিত্যে লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ হোক, এমনটা আমরা আমাদের সময়ের কবি-সাহিত্যিকদের কাছে আশা রাখতেই পারি; যে যার মতাদর্শ নিয়েই লিখুক, দিন শেষে সেটা যেন সাম্প্রদায়িকতার নামান্তর না হয়ে ওঠে, পাঠকের এই কামনা সম্ভবত অযৌক্তিক নয়। পক্ষ-বিপক্ষ থাক, তাতে সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়।
রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' একজন সাধারণ পাঠকের চোখে
লেখক মোজাফ্ফর হোসেন প্রণীত সদ্য পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত, 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' ইতিহাস, তত্ত্ব, সংকট ও সম্ভাবনা বইটির পাঠ শেষ করলাম। ইতোপূর্বে ডায়াসপোরা সাহিত্য সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনও ধারণা ছিলো না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে বইটি পড়ার পর আমি আমার ডায়াসপোরা সত্তাটিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছি এবং এতোদিন আমার ভেতরে যে অস্তিত্ব সংকট ছিলো তার একটা ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছি। আমার যখন বারো বছর বয়স তখন আরও কিছুটা উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সাথে ভারতে চলে যেতে হয়, কিন্তু এই যাওয়ায় আমার কোনও আগ্রহ ছিলো না। অথচ সেই বয়সে আমার মত প্রকাশ কিংবা মতের গুরুত্ব দেয়ার মতোও কেউ ছিলো না। অগ্যতা মেনে নিতে হয়েছে। বহু কেঁদেছি। একটুকরো শৈশবের স্মৃতি আঁকড়ে নতুন সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়েছি। এই মানিয়ে নিয়ে বাঁচা, নতুনভাবে পরিচয় বিনির্মাণ করা যে কতটা কঠিন সেটা বোধকরি ডায়াসপোরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব না, কিংবা বোঝানো!
এইসব নানাবিধ সংকট এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত সাহিত্যকেই বলে ডায়াসপোরা সাহিত্য, যেটা এই বইয়ে বিভিন্ন পর্বে ভাগ করে আলোচনা করেছেন লেখক মোজাফ্ফর হোসেন। তিনি ডায়াসপোরা শব্দটির ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং বর্তমানে এই শব্দটি ব্যবহারের প্রাসংগিকতা নিয়ে বলেছেন, 'ডায়াসপোরা শব্দটি গ্রিক। 'dia' মানে দূরে, 'speirein' অর্থ ছড়িয়ে পড়া।' ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ফসলের বীজ ছড়িয়ে পড়া হলেও শব্দটির অন্য ব্যবহার লক্ষ করা যায় খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ শতাব্দীর দিকে। ইসরাইল থেকে নির্বাসিত ইহুদিদের প্রথম ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঐ সময় আলেক্সান্দ্রিয়ার পণ্ডিতরা হিব্রু বাইবেল বা 'তোরাহ'র প্রথম পাঁচটি বই গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেন। এই অনুবাদে গৃহহীন ইহুদিদের জন্য ক্রিয়াপদ 'diaspeirein' এবং বিশেষ্যপদ 'diaspora'-এর ব্যবহার করা হয়।' আর এই ডায়াসপোরা শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ 'অভিবাসী' কিংবা 'প্রবাসী' নয় কেন, যার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, 'আমরা লক্ষ করবোঃ 'ডায়াসপোরা' এবং 'অভিবাসী' শব্দটি অর্থগতভাবে কাছাকাছি হলেও এদের মধ্যে ধারণাগত পার্থক্য আছে।'
এর পরেই লেখক উপনিবেশ পূর্ব ডায়াসপোরা ঔপনিবেশিক অথবা মধ্যযুগীয় ডায়াসপোরা উপনিবেশ-উত্তর বা আধুনিক ডায়াসপোরা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় গোটা বিশ্বের ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী ও ব্যক্তি, কেন, কীভাবে তারা ডায়াসপোরা? এটার খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। আমরা জানি বর্তমানে বহু মানুষ জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে নিজ 'জন্মভূমি' ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, জাতিসংঘের সুমারি অনুয়ায়ী এর সংখ্যা প্রায় ষাট কোটির ওপরে। বিভিন্ন দেশে থেকে এই মাতৃভূমিচ্যুত জনগোষ্ঠী বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় যে সাহিত্য রচনা করেন তার বিশ্লেষণ করতে আজ ডায়াসপোরা সাহিত্যতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ডায়াসপোরা তাত্ত্বিক সুদেশ মিশ্র এই ডায়াসপোরা তত্ত্বকে তাত্ত্বিকভাবে দুটো ভাগে বিভক্ত করেছেন যথা, সুগার ডায়াসপোরা এবং মসালা ডায়াসপোরা। কিন্তু ব্যাপারটা এহেন সরলরৈখিক কিছু নয়, একটু খোলসা করে বলিঃ আমার স্মৃতিতে কৈশোরপূর্ব বাংলাদেশ আছে কিন্তু আমার ছোট ভাই এবং বোন বাংলাদেশে জন্মেছে অথচ খুব ছোট থাকার কারণে বাংলাদেশ নিয়ে ওদের কোনও নস্টালজিক স্মৃতি নেই।
ফলত জন্মভূমি সম্পর্কে আমাদের ভাইবোনদের ভেতরেই রয়েছে বৈচিত্র্য। যেমন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ত্রিনিদাদবাসী নোবেনজয়ী লেখক ভি এস নাইপল। তাঁর জন্ম ত্রিনিদাদে কিন্তু পিতার ভারতে। আবার কেউ কেউ আছেন অভিবাসী কিংবা প্রবাসী, উন্নত জীবনের জন্য বিদেশে গিয়ে সেই দেশের নাগরিক হয়েছেন অথবা হননি। কেউ কেউ আছেন নির্বাসিত যেমন, তসলিমা নাসরিন, সালমান রুশদী প্রমুখ। এইসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন কোনও লেখক তাঁর দেখা কিংবা না দেখা 'মাতৃভূমি' নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন তখন যেমন নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয় তেমনই সংকট। যেটা হয়েছে সালমান রুশদীর ভারতের ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস 'মিডনাইট চিলড্রেন' নিয়ে; ভারতীয় পাঠক এক্ষেত্রে লেখকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন ইতিহাস বিকৃতির। যেমনটা হয়েছে বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক তহমিমা আনামের 'গার্মেন্টস' উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। ডায়াসপোরা সাহিত্যের নানান দিক, প্রশ্ন ও সম্ভাবনার খুঁটিনাটি নিয়ে রচিত হয়েছে মোজাফ্ফর হোসেন প্রণীত 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' বইটি। এমনকি তত্ত্ব পর্বে তিনি এই কথাটাও উল্লেখ করেছেন যে ডায়াসপোরা লেখকদের সকল লেখাই ডায়াসপোরা সাহিত্য নয়, কেননা ডায়াসপোরা সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেই সাহিত্যকে যেখানে ডায়াসপোরা জীবনের সংকটগুলো তুলনামূলকভাবে স্থান পেয়েছে। আর এমনটাও তো নয় যে সকল ডায়াসপোরা লেখক কেবল ডায়াসপোরা সংকট নিয়েই সাহিত্য রচনা করবেন!
এর পরেই লেখক এতোদিনের অনালোচিত বাংলাদেশি ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন, এই পর্বে লেখক প্রথমে দেশভাগোত্তর ডায়াসপোরা সাহিত্য, বাংলাদেশি বিহারী উর্দুভাষী ডায়াসপোরা এবং রোহিঙ্গা ডায়াসপোরা সম্পর্কে নানান অজানা সংকট ও সম্ভাবনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। দেশ ভাগের ফলে ভিটেচ্যুত হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ, ভারতে থেকে যেমন তৎকালীন পাকিস্তানে চলে গেছে বহু মুসলিম জনগোষ্ঠী তেমনই বহু হিন্দুরা চলে গেছেন ভারতে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ভেতরেই বহু মানুষ ডায়াসপোরা সংকটে ভুগছেন, এমনকি দুই বাংলায় এই নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে অনেক। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ডায়াসপোরা বলেই এই নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে কোনও উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়নি। তেমনই অনালোচিত রয়েছে বাংলাদেশি বিহারী ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী দ্বারা লিখিত উর্দু সাহিত্য। লেখকের ভাষায় বৃহত্তর ভারত ভাগ হয়ে যখন পাকিস্তান নামক আর একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয় তখন ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে এই উর্দুভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী অবিভক্ত পাকিস্তানে আসে। পরবর্তিতে পাকিস্তান ভাগ হয়ে যখন জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ, তখন এই জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে যেতে চাইলেও পাকিস্তান তাঁদের গ্রহণ করেনি। কিন্তু এই জনগোষ্ঠী মনেপ্রাণে রয়ে গেছে পাকিস্তানি, বাংলাদেশকে যেমন তাঁরা গ্রহণ করতে পারেননি তেমনই ভারতীয় হিসেবে পরিচয় দিতেও তাঁদের অনীহা।
ফলত এই বিহারী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী দ্বারা রচিত উর্দু সাহিত্য বাংলাদেশের মূলধারার সাহিত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু কীভাবে এই উর্দু সাহিত্য বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে, সেটা নিয়ে লেখকের মৌলিক আলোচনা প্রশংসনীয়। শুধু তাই নয়, বর্তমানে আরাকান থেকে নির্বাসিত বাংলাদেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের লিখিত সাহিত্য প্রাধান্য পেয়েছে এই বইয়ে। আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক যাঁরা বিদেশে থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করছেন তাঁদের সংকট ও সম্ভাবনার। উঠে এসেছে পাকিস্তানি ডায়াসপোরা সাহিত্য থেকে শুরু করে ভারতীয় বহু ডায়াসপোরা লেখকদের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁদের সাহিত্যকর্ম। সাক্ষাৎকার পর্বে ডায়াসপোরা লেখকদের সাথে আলোচনায় আলোচিত হয়েছে বহু ডায়াসপোরা অভিজ্ঞতার। ফলত এই পর্ব পাঠকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি আমি। সাথে লেখকের অনুবাদে পাঁচ ডায়াসপোরা লেখকের আড্ডা পাঠকদের ঝোলা সমৃদ্ধ করবে নিশ্চিত।
ছোট গল্পকার-অনুবাদক-প্রাবন্ধিক মোজাফ্ফর হোসেনের সরল এবং সাবলীল গদ্যশৈলী ইতোমধ্যে এপার-ওপারের বাঙালি পাঠক মহলে খুবই আলোচিত। একাডেমিক জটিলতা এড়িয়ে তিনি তত্ত্বের মতো ভারি বিষয়কে খুবই সরল এবং মনোগ্রাহী করে উপস্থাপন করেন যা পাঠক নন্দিত। 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' ও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এই বইটা পড়তে পড়তে আমার একটা অপেক্ষা ছিলো, শেষতক সেটা আর পূরণ হয়নি! ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হবে কিন্তু তসলিমা নাসরিনের মতো আলোচিত লেখক আসবেন না, এটা কি হয়! দুঃখের বিষয়, মাঝে মাঝে তিনি উঁকি দিয়েছেন বটে তবে আসেননি। কেন লেখক তসলিমাকে এড়িয়ে গেছেন সেটা নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই তসলিমা নাসরিনের লেখা 'ফেরা' উপন্যাসটি বাংলা ভাষায় লিখিত ডায়াসপোরা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নমুনা বলে মনে করি আমি। শৈলী ও বিনির্মাণগত দুর্বলতা থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে এতো এতো দুর্বল লেখকের মাঝে তসলিমা নাসরিন একেবারে অবহেলার নয়। যাইহোক ২০২০ এর অমর একুশে বইমেলায় অনুসন্ধিপ্সু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ কেবল নয়, বরং সব ধরনের পাঠকের মনের খোরাক যোগাবে, 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' এতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
কবির মুকুল প্রদীপ
কবি-সমালোচক, নাট্যকর্মী ও ডান্স কোরিওগ্রাফার।
তারাগঞ্জ বাজার, নালিতাবাড়ি, শেরপুর।
ইমেইল-kobirmukul2222@gmail.com
ফোন নং ০১৯২৯৪৭৯৯৪৩
কবি-সমালোচক, নাট্যকর্মী ও ডান্স কোরিওগ্রাফার।
তারাগঞ্জ বাজার, নালিতাবাড়ি, শেরপুর।
ইমেইল-kobirmukul2222@gmail.com
ফোন নং ০১৯২৯৪৭৯৯৪৩
মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২০
একজন ওদা ও একটি লক্ষ্মীপেঁচা
আমাদের ঘরের পেছনদিকটায় বাঁশঝোপ, তার পেছনে এলোমেলো কিছুটা ফসলি জমি, পাগার, ডোবা। একটা সময় এই বাঁশঝোপে অনেক পাখি আসতো। সকালসন্ধ্যা কান ঝালাপালা করে দিতো ডেকে ডেকে। কিন্তু সে বেশ কবছর আগের কথা, যেবার আমার ছেলেটা হলো! ওর বয়স এখন তিন বছর এগার মাস, শুদ্ধ করে কথা বলতে শিখেছে। যেটা আমাদের কাছে বেশ গর্বের, কেননা আমরা যেখানে থাকি এখানে সকলেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, এমনকি আমিও। অথচ ছেলেটা যে কীভাবে শুদ্ধ বাংলা শিখল এটা খুবই আশ্চর্যের! দুঃখের বিষয় হচ্ছে এখন আর একটা পাখিও এই বাঁশঝোপে আসে না। সেই যেবার ছেলেটা হলো তখন থেকে! আজ এই মুহূর্তে সেই ছেলেটাকেই ওইসব পাখিদের কথা বলে বোঝানো আমার পক্ষে হয়ে পড়েছে চরম দুরূহ।
এইক্ষণে কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিতে চাই আপনাদের অনুমতি পেলে! এও বেশ আগের কথা, তখন আমরা পরিবারসহ বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে কেবল থিতু হতে চেষ্টা করছি। পাঁচ পেটের সংসারে রোজগেরে শুধু বাবা, লেগে থাকতো সর্বোক্ষণিক অনটন। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাই চাপ পড়লো আমার ওপরে। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আমি তখন একটি সাইকেলের সিট বানানোর কারখানায় কাজ নিয়েছি। সালটা ছিলো দুই হাজার। এটা মনে থাকার কারণ হচ্ছে তখন আমির খানের একটা ছবি বেরিয়েছিলো 'মেলা' নামের, এই ছবিতে একটা গান ছিলো, 'দেখো টু থাউজেন জামানা আগায়া' এরকম।
যাইহোক আসল কথা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে তখন চল্লিশোর্ধা এক সাদাসিধে নিসন্তান দম্পত্তি এসেছিলো এখানে। লোকটা হেলপারির কাজ নিয়েছিলো আমি যেখানে কাজ করি সেই কারখানায়। সকলকেই তিনি 'ওদা' বলে ডাকতেন, এভাবেই একপর্যায়ে তাকেও সকলে 'ওদা' বলে ডাকতে শুরু করে দিলে, শেষতক লোকটার নামই হয়ে গেলো 'ওদা'। এতে লোকটার কোনও আপত্তি ছিলো না, খুশি খুশি মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তাছাড়া এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে এলে মানিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। লোহালক্করের যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ হতো বলে বিশ্বকর্মা পুজোটা খুব ধুমধাম করে পালন করা হতো কারখানায়, মালিক পক্ষ এই দিনটাতে কর্মচারিদের ইচ্ছামতো মদ, মাংস খাওয়াতো।
মনে পড়ে সেবারেও খুব ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পুজা হয়েছিলো। হয়েছিলো মদ মাংসের এলাহি আয়োজন। এই একটা দিন খাইয়ে বছরভর কর্মচারিদের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন করে মালিক পক্ষ। কারখানায় আমরা যারা মদখোর ছিলাম সকলেই আগে থেকে লোড হয়ে থাকতাম, পরে যখন মূল খাওয়াদাওয়ার পর্ব চলত তখন আর তেমন খেতে পারতাম না। ওদা মদ চিনতো না, মদের মতো চিনতো না স্লাদও। তো হলো কি একজন মজা করে ওদার ভাতের থালায় স্লাদ দিয়ে দিয়েছিলো, আর ওদার সেকি রাগ! এই হাবাগোবা লোকটার ভেতরেরও যে এতো রাগ থাকতে পারে, সেটা বোধহয় দুর্বোধ্য ছিলো স্বয়ং বিশ্বকর্মারও! ওদা চিৎকার করে বলেছিলো, 'হুদাই খালি মোর লগে চ্যাঙ্রামি করে, মুই কি কাঁচা হোশা, কাঁচা টমেটু, কাঁচা পেঁয়াইজ খাই! মুই আর খামু না।' বাপরে বাপ কে তখন ওদাকে বোঝায় যে ওগুলো হচ্ছে স্লাদ, খেলে হজম ভালো হয়। আর কেইবা শোনে কার কথা! ওদার তখন একটাই বক্তব্য, 'মুই আর খামু না।'
আসলে সব কথা সবসময় সবাইকে বোঝানো সম্ভব নয়। যেমন আজ এই মুহূর্তে আমার ছেলেটিকে আমি বোঝাতে পারছি না ওই চলে যাওয়া পাখিদের কথা! তাছাড়া বাংলাদেশি মানুষ একটু অভিমানী বেশি হয়, কিন্তু বিদেশবিভূঁইয়ে ওইসব ঠুনকো অভিমানের কোনও দাম থাকে না, থাকতে নেই। এটা আমি বাংলাদেশি বলেই হয়তো তখন কিছুটা বুঝেছিলাম, ওদা বোঝেনি। পরে আস্তে আস্তে লোকটা হারিয়ে গেলো, কিন্তু কোথায় যে গেলো! হয়তো সেখানেই গেছে, যেখানে সরল মানুষেরা যায়! তবে আমার গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়, তাছাড়া এমনও না যে আমি ছেলেকে পাখিদের কথা বলি না। বছর দুয়েক আগে কবি বিনয় কর্মকার, শফিক সেলিম, সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ভাই এসেছিলেন আমাদের এখানে বেড়াতে, ছেলের জন্য বিনয়দা উপহার হিসেবে এনেছিলেন একটি দেশি-বিদেশি পাখির নাম ও বিবরণসহ বই।
ওই বইটা থেকে ছবি দেখে, আমার কাছে থেকে নাম শুনে ছেলে এখন অনেক বিদেশি পাখি চিনেছে। যথা নর্দান মকিংবার্ড, গোল্ডেন ফিজন্ট, দ্য হুপো, পাফিন, হামিংবার্ড, করডিনাল, কন্ডর। মাঝে মাঝে তোতা পাখির মতো আধো আধো সুরে এইসব বিদেশি পাখির নামগুলো আপন মনে উচ্চারণ করে। দূর থেকে শুনে আমার যে কি ভালোলাগে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল! মুগ্ধ হই, গর্বও হয়। পিতা হিসেবে মুহূর্তগুলো আমি চেটেপুটে উপোভোগ করি। দুঃখ হয় এই ভেবে, বাড়িতে আর কোনও পাখি আসে না, কেবল কতগুলো বুভুক্ষু দাঁড়কাক ছাড়া। কাককে আমার পাখি ভাবতে ইচ্ছে করে না, ওদের যা আচরণ! সুযোগ পেলেই বাচ্চা-বুড়োদের হাত থেকে ছোঁ মেরে খাবার কেড়ে নিয়ে উধাও হয়, একেবারে দেশের নীতিহীন মানুষগুলোর মতোন। হয়ত এই কেড়ে নেবার অভ্যাস ওরা মানুষের থেকেই শিখেছে! যদিও কথায় কথায় ওরা মানুষের মতো স্বগোত্রীয়দের মারে না, বোমা ফাটায় না, ধর্ম নিয়েও কোনও গর্ব নেই, বিধর্মীদের ঘৃণা করে না।
ইদানীং আমাকে আবার একটা বদভ্যাস পেয়ে বসেছে, ঘুম থেকে জেগেও বিছানা ছাড়ি না। লেপ মুড়ি দিয়ে চুপ করে থাকি। ছেলে আর তার মা খুব ভোরেই উঠে যায়, আমাকে ডেকে বিরক্ত করে না। তবে মোটু পাতলু দেখে দেখে ছেলে এখন ডক্টর ঝটকার মতো অনেক কিছু আবিষ্কার করে, এবং আবিষ্কৃত বস্তুটি আমাকে দেখাতে উদগ্রীব ছেলে ছুটে আসে ঘরে। বলে, 'দেখ বাবা কি আবিষ্কার করেছি।' তার চোখেমুখে বিস্ময়! সেই বিস্ময়কর বস্তুটি দেখে ওকে খুশি করতে আমিও বিস্ময়বোধক ভাব প্রকাশ করি। ছেলে খুশি হয় এবং বারবার তার নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আমাকে দেখাতে আসে, ফলে জেগে শুয়ে থাকার মজাটা আর তেমন উপভোগ করতে পারি না। বাবার কথা মনে পড়ে, এমন কতো অত্যাচার সহ্য না করতে হয়েছে তাকে! তবে পিতৃত্ব কিংবা মাতৃত্বের আলাদা স্বাদ আছে, যেটা না থাকলে মানুষ সন্তান প্রতিপালন করতো বলে মনে হয় না আমার!
আমি আসলে কোনও দক্ষ গল্প বলিয়ে নই, এক প্রসঙ্গ লিখতে নানান অযৌক্তিক কথা বলে বলে কেঁচিয়ে ফেলি, ফলত আর মূল প্রসঙ্গে ফিরতে পারি না। এই এখন যেমন পারছি না! তাই লেখাটা ফেসবুকে পোস্ট দিলে কেউ ছুঁয়েও দেখবে না, কেউ কেউ হয়ত লাইক দেবে কিন্তু পড়বে না। জানেন সেদিন কি হলো! সকালে আমি বিছানায় শুয়ে আছি ওমনি ছেলেটা এসে হঠাৎ ডাকতে শুরু করে দিলো। ভাবলাম কি আবার আবিষ্কার করেছে! কিন্তু না, বলছে, 'বাবা দেখে যাও জঙ্গলে কত্তবড় পাখি এসেছে।' এও আবার হয় নাকি! কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা, হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ঘরের পেছনদিকের বাঁশঝোপের কাছে। দেখি সত্যিই একটা বড় প্রজাতির লক্ষ্মীপেঁচা শুকনো বাঁশপাতার ভেতর পড়ে আছে, ওপরে কতোগুলো দাঁড়কাক! কাকগুলো যখনই পেঁচাটাকে আক্রমণ করতে চাইছে, শক্ত ঠোঁট হাঁ করে ফ্যাস্ ফ্যাস্ শব্দ করে পেঁচাটা অত্মরক্ষা করার চেষ্টা করছে।
আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে কাকগুলোকে তাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু ওরা গেলো না, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কা কা করে ডাকতে লাগলো। আমি পেঁচাটাকে ধরতে চাইলাম, ফ্যাস্ ফ্যাস্ করে সে আমাকেও ঠোঁকর দিতে চাইলো। কিন্তু আমি পেঁচাটাকে ধরে ফেললাম এবং বাড়িতে নিয়ে এসে দেখলাম, বাম পাশের ডানাটা ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, সেকারণেরই উড়তে পারছে না। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে আমি ওর ক্ষতস্থানে বাড়িতে থাকা লাল ওষুধ লাগিয়ে মুরগির খাঁচার ভেতর পুরে রাখলাম। কিন্তু বাঁধসাঁধলো ছেলেটা, একটা কঞ্চির লাঠি দিয়ে খোঁচাতে শুরু করলো পেঁচাটাকে। আমি ছেলেকে বোঝাতে চাইলাম এই বলে যে, 'বাবা ও ব্যথা পাচ্ছে, তুমি ওকে খুঁচিও না।' উলটে ছেলে ভীষণ কান্না জুড়ে দিলো, কান্না থামাতে ওকে খাবার কিনে দিতে চাইলাম কিন্তু মানলো না। হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায় আমি শেষতক দিনের কাজে বেরিয়ে পড়লাম।
দুপুরে বাড়ি ফিরলে বউ বল্লো, 'দেখ পেঁচাটার কি অবস্থা করেছে তোমার ছেলে।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন কি হয়েছে?' সে বলতে লাগলো, 'কি আর হবে! পায়ে দড়ি বেঁধে পেঁচাটাকে টেনে হিঁচড়ে একেবার যাচ্ছেতাই অবস্থা করেছে তোমার গুণোধর, গিয়ে দেখ।' আমি মুরগির খোঁয়াড়ের কাছে গিয়ে দেখি, ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ে আছে পেঁচাটা। আমার পায়ের শব্দ শুনে, শরীরটা একটু হালকা ঝাকুনি দিয়ে, খুব কষ্ট করে সে তার চোখ খুলে তাকালো। মনে হলো এই চোখ আমি আগেও দেখেছি, অসহায় এবং করুণ। কিন্তু কোথায় দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না; সিন্ধান্ত নিলাম ছেলে ঘুমালে রাতেই পেঁচাটাকে ছেড়ে দেবো, এই অবস্থায় ওকে দেখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
বিকেলে আর কোনও কাজেই মনষ্ক হতে পারছিলাম না। পেঁচাটার করুণ চোখ আমার ভেতরে ছড়িয়ে দিয়েছিলো এক অদ্ভুত বিষণ্নতা, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম রাতের। তাই রাত দশটা নাগাত বাড়ি ফিরে সোজা খোঁয়াড়ের থেকে পেঁচাটাকে বের করে বাঁশঝোপের পেছনের মাঠে নিয়ে এলাম। মৃদু জোছনা এলিয়ে পড়েছে তখন মাঠে, সেই আলোয় পেঁচাটাকে এখন কিছুটা সতেজ দেখাচ্ছে। নিশাচর বলেই হয়ত এই সতেজতা, কারণ রাতেই ওরা স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বতঃস্ফূর্ত। আমি আর দেরি না করে এবার মাঠেই পেঁচাটাকে ছেড়ে দিলাম, মুহূর্তে ডানায় একটা ঝাড়া দিয়ে সে দেবদূতের মতো মানুষে রূপান্তরিত হয়ে আমার সামনে দাঁড়াল, কাঁধের একটু নিচে তার বড় বড় একজোড়া ডানা! আমি প্রথমে চমকে গেলাম কিন্তু পরোক্ষণেই লক্ষ করলাম ওমা, এতো আমাদের সেই ওদা! এতো বছর পর ওদাকে সামনে দেখে এতো প্রশ্ন এসে ভিড় করলো যে আমি তৎক্ষণাৎ কিছুই বলতে পারলাম না। কিন্তু ওদা আমার কোনও কথা শোনার অপেক্ষা না করে তার জখমি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়াল দিলো, প্রথমে উড়তে কিছুটা অসুবিধা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার সাবলীলতা খুঁজে পেল এবং মুহূর্তে গভীর অন্ধাকারে মিলিয়ে গেলো। হতভম্ব আমি অস্ফুট স্বরে কেবল উচ্চারণ করলাম, 'ওদা তুমি কোথায় থাক? সরল মানুষেরা কি তবে তোমার মতো লুপ্তপ্রায় লক্ষ্মীপেঁচা হয়ে যায়?
এইক্ষণে কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিতে চাই আপনাদের অনুমতি পেলে! এও বেশ আগের কথা, তখন আমরা পরিবারসহ বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে কেবল থিতু হতে চেষ্টা করছি। পাঁচ পেটের সংসারে রোজগেরে শুধু বাবা, লেগে থাকতো সর্বোক্ষণিক অনটন। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাই চাপ পড়লো আমার ওপরে। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আমি তখন একটি সাইকেলের সিট বানানোর কারখানায় কাজ নিয়েছি। সালটা ছিলো দুই হাজার। এটা মনে থাকার কারণ হচ্ছে তখন আমির খানের একটা ছবি বেরিয়েছিলো 'মেলা' নামের, এই ছবিতে একটা গান ছিলো, 'দেখো টু থাউজেন জামানা আগায়া' এরকম।
যাইহোক আসল কথা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে তখন চল্লিশোর্ধা এক সাদাসিধে নিসন্তান দম্পত্তি এসেছিলো এখানে। লোকটা হেলপারির কাজ নিয়েছিলো আমি যেখানে কাজ করি সেই কারখানায়। সকলকেই তিনি 'ওদা' বলে ডাকতেন, এভাবেই একপর্যায়ে তাকেও সকলে 'ওদা' বলে ডাকতে শুরু করে দিলে, শেষতক লোকটার নামই হয়ে গেলো 'ওদা'। এতে লোকটার কোনও আপত্তি ছিলো না, খুশি খুশি মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তাছাড়া এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে এলে মানিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। লোহালক্করের যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ হতো বলে বিশ্বকর্মা পুজোটা খুব ধুমধাম করে পালন করা হতো কারখানায়, মালিক পক্ষ এই দিনটাতে কর্মচারিদের ইচ্ছামতো মদ, মাংস খাওয়াতো।
মনে পড়ে সেবারেও খুব ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পুজা হয়েছিলো। হয়েছিলো মদ মাংসের এলাহি আয়োজন। এই একটা দিন খাইয়ে বছরভর কর্মচারিদের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন করে মালিক পক্ষ। কারখানায় আমরা যারা মদখোর ছিলাম সকলেই আগে থেকে লোড হয়ে থাকতাম, পরে যখন মূল খাওয়াদাওয়ার পর্ব চলত তখন আর তেমন খেতে পারতাম না। ওদা মদ চিনতো না, মদের মতো চিনতো না স্লাদও। তো হলো কি একজন মজা করে ওদার ভাতের থালায় স্লাদ দিয়ে দিয়েছিলো, আর ওদার সেকি রাগ! এই হাবাগোবা লোকটার ভেতরেরও যে এতো রাগ থাকতে পারে, সেটা বোধহয় দুর্বোধ্য ছিলো স্বয়ং বিশ্বকর্মারও! ওদা চিৎকার করে বলেছিলো, 'হুদাই খালি মোর লগে চ্যাঙ্রামি করে, মুই কি কাঁচা হোশা, কাঁচা টমেটু, কাঁচা পেঁয়াইজ খাই! মুই আর খামু না।' বাপরে বাপ কে তখন ওদাকে বোঝায় যে ওগুলো হচ্ছে স্লাদ, খেলে হজম ভালো হয়। আর কেইবা শোনে কার কথা! ওদার তখন একটাই বক্তব্য, 'মুই আর খামু না।'
আসলে সব কথা সবসময় সবাইকে বোঝানো সম্ভব নয়। যেমন আজ এই মুহূর্তে আমার ছেলেটিকে আমি বোঝাতে পারছি না ওই চলে যাওয়া পাখিদের কথা! তাছাড়া বাংলাদেশি মানুষ একটু অভিমানী বেশি হয়, কিন্তু বিদেশবিভূঁইয়ে ওইসব ঠুনকো অভিমানের কোনও দাম থাকে না, থাকতে নেই। এটা আমি বাংলাদেশি বলেই হয়তো তখন কিছুটা বুঝেছিলাম, ওদা বোঝেনি। পরে আস্তে আস্তে লোকটা হারিয়ে গেলো, কিন্তু কোথায় যে গেলো! হয়তো সেখানেই গেছে, যেখানে সরল মানুষেরা যায়! তবে আমার গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়, তাছাড়া এমনও না যে আমি ছেলেকে পাখিদের কথা বলি না। বছর দুয়েক আগে কবি বিনয় কর্মকার, শফিক সেলিম, সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ভাই এসেছিলেন আমাদের এখানে বেড়াতে, ছেলের জন্য বিনয়দা উপহার হিসেবে এনেছিলেন একটি দেশি-বিদেশি পাখির নাম ও বিবরণসহ বই।
ওই বইটা থেকে ছবি দেখে, আমার কাছে থেকে নাম শুনে ছেলে এখন অনেক বিদেশি পাখি চিনেছে। যথা নর্দান মকিংবার্ড, গোল্ডেন ফিজন্ট, দ্য হুপো, পাফিন, হামিংবার্ড, করডিনাল, কন্ডর। মাঝে মাঝে তোতা পাখির মতো আধো আধো সুরে এইসব বিদেশি পাখির নামগুলো আপন মনে উচ্চারণ করে। দূর থেকে শুনে আমার যে কি ভালোলাগে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল! মুগ্ধ হই, গর্বও হয়। পিতা হিসেবে মুহূর্তগুলো আমি চেটেপুটে উপোভোগ করি। দুঃখ হয় এই ভেবে, বাড়িতে আর কোনও পাখি আসে না, কেবল কতগুলো বুভুক্ষু দাঁড়কাক ছাড়া। কাককে আমার পাখি ভাবতে ইচ্ছে করে না, ওদের যা আচরণ! সুযোগ পেলেই বাচ্চা-বুড়োদের হাত থেকে ছোঁ মেরে খাবার কেড়ে নিয়ে উধাও হয়, একেবারে দেশের নীতিহীন মানুষগুলোর মতোন। হয়ত এই কেড়ে নেবার অভ্যাস ওরা মানুষের থেকেই শিখেছে! যদিও কথায় কথায় ওরা মানুষের মতো স্বগোত্রীয়দের মারে না, বোমা ফাটায় না, ধর্ম নিয়েও কোনও গর্ব নেই, বিধর্মীদের ঘৃণা করে না।
ইদানীং আমাকে আবার একটা বদভ্যাস পেয়ে বসেছে, ঘুম থেকে জেগেও বিছানা ছাড়ি না। লেপ মুড়ি দিয়ে চুপ করে থাকি। ছেলে আর তার মা খুব ভোরেই উঠে যায়, আমাকে ডেকে বিরক্ত করে না। তবে মোটু পাতলু দেখে দেখে ছেলে এখন ডক্টর ঝটকার মতো অনেক কিছু আবিষ্কার করে, এবং আবিষ্কৃত বস্তুটি আমাকে দেখাতে উদগ্রীব ছেলে ছুটে আসে ঘরে। বলে, 'দেখ বাবা কি আবিষ্কার করেছি।' তার চোখেমুখে বিস্ময়! সেই বিস্ময়কর বস্তুটি দেখে ওকে খুশি করতে আমিও বিস্ময়বোধক ভাব প্রকাশ করি। ছেলে খুশি হয় এবং বারবার তার নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আমাকে দেখাতে আসে, ফলে জেগে শুয়ে থাকার মজাটা আর তেমন উপভোগ করতে পারি না। বাবার কথা মনে পড়ে, এমন কতো অত্যাচার সহ্য না করতে হয়েছে তাকে! তবে পিতৃত্ব কিংবা মাতৃত্বের আলাদা স্বাদ আছে, যেটা না থাকলে মানুষ সন্তান প্রতিপালন করতো বলে মনে হয় না আমার!
আমি আসলে কোনও দক্ষ গল্প বলিয়ে নই, এক প্রসঙ্গ লিখতে নানান অযৌক্তিক কথা বলে বলে কেঁচিয়ে ফেলি, ফলত আর মূল প্রসঙ্গে ফিরতে পারি না। এই এখন যেমন পারছি না! তাই লেখাটা ফেসবুকে পোস্ট দিলে কেউ ছুঁয়েও দেখবে না, কেউ কেউ হয়ত লাইক দেবে কিন্তু পড়বে না। জানেন সেদিন কি হলো! সকালে আমি বিছানায় শুয়ে আছি ওমনি ছেলেটা এসে হঠাৎ ডাকতে শুরু করে দিলো। ভাবলাম কি আবার আবিষ্কার করেছে! কিন্তু না, বলছে, 'বাবা দেখে যাও জঙ্গলে কত্তবড় পাখি এসেছে।' এও আবার হয় নাকি! কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা, হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ঘরের পেছনদিকের বাঁশঝোপের কাছে। দেখি সত্যিই একটা বড় প্রজাতির লক্ষ্মীপেঁচা শুকনো বাঁশপাতার ভেতর পড়ে আছে, ওপরে কতোগুলো দাঁড়কাক! কাকগুলো যখনই পেঁচাটাকে আক্রমণ করতে চাইছে, শক্ত ঠোঁট হাঁ করে ফ্যাস্ ফ্যাস্ শব্দ করে পেঁচাটা অত্মরক্ষা করার চেষ্টা করছে।
আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে কাকগুলোকে তাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু ওরা গেলো না, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কা কা করে ডাকতে লাগলো। আমি পেঁচাটাকে ধরতে চাইলাম, ফ্যাস্ ফ্যাস্ করে সে আমাকেও ঠোঁকর দিতে চাইলো। কিন্তু আমি পেঁচাটাকে ধরে ফেললাম এবং বাড়িতে নিয়ে এসে দেখলাম, বাম পাশের ডানাটা ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, সেকারণেরই উড়তে পারছে না। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে আমি ওর ক্ষতস্থানে বাড়িতে থাকা লাল ওষুধ লাগিয়ে মুরগির খাঁচার ভেতর পুরে রাখলাম। কিন্তু বাঁধসাঁধলো ছেলেটা, একটা কঞ্চির লাঠি দিয়ে খোঁচাতে শুরু করলো পেঁচাটাকে। আমি ছেলেকে বোঝাতে চাইলাম এই বলে যে, 'বাবা ও ব্যথা পাচ্ছে, তুমি ওকে খুঁচিও না।' উলটে ছেলে ভীষণ কান্না জুড়ে দিলো, কান্না থামাতে ওকে খাবার কিনে দিতে চাইলাম কিন্তু মানলো না। হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায় আমি শেষতক দিনের কাজে বেরিয়ে পড়লাম।
দুপুরে বাড়ি ফিরলে বউ বল্লো, 'দেখ পেঁচাটার কি অবস্থা করেছে তোমার ছেলে।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন কি হয়েছে?' সে বলতে লাগলো, 'কি আর হবে! পায়ে দড়ি বেঁধে পেঁচাটাকে টেনে হিঁচড়ে একেবার যাচ্ছেতাই অবস্থা করেছে তোমার গুণোধর, গিয়ে দেখ।' আমি মুরগির খোঁয়াড়ের কাছে গিয়ে দেখি, ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ে আছে পেঁচাটা। আমার পায়ের শব্দ শুনে, শরীরটা একটু হালকা ঝাকুনি দিয়ে, খুব কষ্ট করে সে তার চোখ খুলে তাকালো। মনে হলো এই চোখ আমি আগেও দেখেছি, অসহায় এবং করুণ। কিন্তু কোথায় দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না; সিন্ধান্ত নিলাম ছেলে ঘুমালে রাতেই পেঁচাটাকে ছেড়ে দেবো, এই অবস্থায় ওকে দেখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
বিকেলে আর কোনও কাজেই মনষ্ক হতে পারছিলাম না। পেঁচাটার করুণ চোখ আমার ভেতরে ছড়িয়ে দিয়েছিলো এক অদ্ভুত বিষণ্নতা, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম রাতের। তাই রাত দশটা নাগাত বাড়ি ফিরে সোজা খোঁয়াড়ের থেকে পেঁচাটাকে বের করে বাঁশঝোপের পেছনের মাঠে নিয়ে এলাম। মৃদু জোছনা এলিয়ে পড়েছে তখন মাঠে, সেই আলোয় পেঁচাটাকে এখন কিছুটা সতেজ দেখাচ্ছে। নিশাচর বলেই হয়ত এই সতেজতা, কারণ রাতেই ওরা স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বতঃস্ফূর্ত। আমি আর দেরি না করে এবার মাঠেই পেঁচাটাকে ছেড়ে দিলাম, মুহূর্তে ডানায় একটা ঝাড়া দিয়ে সে দেবদূতের মতো মানুষে রূপান্তরিত হয়ে আমার সামনে দাঁড়াল, কাঁধের একটু নিচে তার বড় বড় একজোড়া ডানা! আমি প্রথমে চমকে গেলাম কিন্তু পরোক্ষণেই লক্ষ করলাম ওমা, এতো আমাদের সেই ওদা! এতো বছর পর ওদাকে সামনে দেখে এতো প্রশ্ন এসে ভিড় করলো যে আমি তৎক্ষণাৎ কিছুই বলতে পারলাম না। কিন্তু ওদা আমার কোনও কথা শোনার অপেক্ষা না করে তার জখমি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়াল দিলো, প্রথমে উড়তে কিছুটা অসুবিধা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার সাবলীলতা খুঁজে পেল এবং মুহূর্তে গভীর অন্ধাকারে মিলিয়ে গেলো। হতভম্ব আমি অস্ফুট স্বরে কেবল উচ্চারণ করলাম, 'ওদা তুমি কোথায় থাক? সরল মানুষেরা কি তবে তোমার মতো লুপ্তপ্রায় লক্ষ্মীপেঁচা হয়ে যায়?
শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০
কবি দ্বীপ সরকারের কাব্য, 'ডারউইনের মুরিদ হবো' আত্মপ্রতিকৃতি
'এই একঘেয়েমি বিরুদ্ধাচার কেন? সহনশীল হলে ক্ষতি কি হে দাপুটে আকাশ?
একটু নিরপেক্ষ হতে শেখো'-
আকাশকে মাটিতে নামিয়ে, সম্মুখে দাঁড় করিয়ে কবিরাই বোধহয় এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন। উপদেশও দিতে পারেন, কেননা তিনি কবি, কোনও সাধারণ মানুষ নয়। এটা অবশ্যই মিথ্যে নয়। তবুও এভাবে কবিদের এলিয়েন বানিয়ে ফেলার প্রয়াস কিংবা মহৎ ভাবাটা রাজনৈতিক; পীড়াদায়কও বটে। তবে প্রকৃত কবি অবশ্যই একটি ভিন্ন সত্তা লালন করেন, সাধারণের মাঝে থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠার প্রয়াস পায় তাঁর জীবন ও কাব্যে। কবি দ্বীপ সরকারের কাব্য, 'ডারউইনের মুরিদ হবো' পাঠের পর আমারও তেমনটাই মনে হয়েছে। কারণ জীবনের ভেতর থেকে জীবনকেই বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে খুঁজে ফিরেছেন কবি, যার ভেতরে স্পষ্ট হয়েছে কবির বোধ, নির্মাণ দক্ষতা এবং আত্মপ্রতিকৃতি।
গুহাযুগ থেকে কৃষিনির্ভর ও আধুনিক জীবনে আসতে মানুষকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। যাপনপদ্ধতির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে চিন্তার জগত, ফলত কবিতার ভেতরেও এইসব বিবর্তন লক্ষ করা যায়। তাই বিজ্ঞজন ও বিদগ্ধ পাঠক মনে করেন ইতিহাসের বিশুদ্ধ নির্যাস কবিতার ভেতরেই দৃশ্যমান হয়। সময়ের কবিতায় পাঠক এমন বিশ্ববীক্ষা পছন্দ করেন। কিন্তু ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় অন্য আর এক অভিজ্ঞতার সম্মুখে, প্রমাণ করে দেন মানুষ আসলে স্মৃতিকাতরতা নামক এক রোগে আক্রান্ত। কারণ মানুষ প্রকৃতি সাংঘর্ষিক, বহন করেন দীর্ঘ যাপনাভিজ্ঞতার প্রত্ন, ফলশ্রুত সভ্যতার আড়ালে মানুষকে ভোগ করতে হয় বহু শারীরীক প্রতিবন্ধকতা। কবিরাও এর ব্যতিক্রম নন, কবিরাও যাপন অভিজ্ঞতা, দর্শন, স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত হন, ফলে তাঁদের কবিতাকর্মটিও হয়ে পড়ে একরৈখিক। 'ডারউইনের মুরিদ হবো' কাব্যে কবি দ্বীপ সরকার এমন অভিজ্ঞতাকে সচেতনভাবে অতিক্রম করার প্রয়াস পেয়েছেন, আবার আক্রান্তও হয়েছেন।
এই কাব্যের ভূমিকায় কবি-প্রাবন্ধিক বীরেন মুখার্জী যথার্থই বলেছেন, বিষয় আশয়ের বাসনা থেকে বেরিয়ে যদি ধ্যানি হতে পারেন তবেই কবি দ্বীপ সরকারের মোক্ষ লাভের আশা আছে। তিনি এই কাব্যে ছন্দহীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই কাব্য নিয়ে কিছু লিখতে বসে আমার যখন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ভিন্নভাষার গোলাপজলে'র দ্বারস্ত হতে হয়েছে, তখনই মনে হয়েছে--প্রথম গ্রন্থ থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থে কবি পাঠকদের অন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করতে চেয়েছেন। ফলে কবিতা হয়ে উঠেছে নিরীক্ষাপ্রবন, যার চাপ এসে পড়েছে কবিতার শরীরে। ভাষা, ছন্দ এবং কাঠামোর ওপর। আমি কবিতায় নিরীক্ষার পক্ষে তবে শিল্পের শাশ্বত স্বতঃস্ফূর্ততাকে অক্ষুণ্ন রেখে। কবিদের এই একটাই তো অস্ত্র, 'শব্দবাণ।' কবি দ্বীপ সরকারকে এই 'শব্দবাণ' আরও শাণিত করতে হবে, কেননা তাঁর কবিতায় শব্দজট হয়ত নেই কিন্তু মেদবহুল; বিনির্মাণগত ত্রুটি আছে। নিম্নে আমি এই ধরনের কিছু স্তবক তুলে দিচ্ছি পাঠকের জ্ঞাতার্থে-
এক কুয়াশা সকালে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসলো 'চোখ মোড়ানো' বেজি
বিষাক্ত গোখরা লেজের ওপর দাঁড়ালো এবং
বেজির 'চোখ মুখে' প্রাজ্ঞের বিষ ছুড়ে দিলো-
[বেজি ও গোখরা]
এই বুদবুদের 'নিকটে' একদিন প্রশ্ন করেছিলাম
[বুদবুদ]
তবে 'উনুনে বসা' তহমিনা খাতুন উত্তর দিয়েছিলেন
[ঐ]
উজানে বাড়ি তার- সাঁতার শিখেছি যেতে
অক্টোপাস এসে ঘিরে ফেললো- রক্ত চুষে খেতে
যুদ্ধের ডানা উঁচিয়ে- একাত্তরের গল্প শুনোই
পাতাল থেকে মুক্তো কুড়ানোর অভিজ্ঞতা বুনোই
হেঁচকা দেই, খুলে যায় পাতাসমূহের বল্টু ও নাট
অক্টোপাস মরে গেলো- সাঁতরিয়ে পেরলাম ঘাট
[ডুমুর ডুমুর চোখ তার]
একদিন শিশিরের সাথে বাজখাই আকাশের বিরোধ আঁটে-
চাকচিক্য রৌদ্রের ফেনা ছিটাতে থাকলো
ভোরে শিশিরের মৌন মিছিল আগুনের ফায়ারিং চালালো
‘শিশিরের জিবের ভেতর গুজিয়ে দিলো টেরাকাঁটা মাছ’
অন্য ভাষার ছেদ চিহ্ন-
[শিশির আর ঘাসখেকো গাভী]
চোখ মোড়ানো বেজি 'শব্দবন্ধ' আমার সম্মুখে কোনও স্পষ্ট চিত্র কিংবা চিত্রকল্প নয়, কারণ এমন শব্দবন্ধ আমার অপরিচিত এবং দুর্বোধ্য কিংবা 'চোখ মুখে' না হয়ে হতে পারতো 'চোখেমুখে'। হয়ত এ আমার নিজেরই অক্ষমতা! তবে 'এই বুদবুদের নিকটে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম' কিংবা 'উনুনে বসা তহমিনা খাতুন' এর মতো পঙ্ক্তি অবশ্যই ভুল। কারণ 'তহমিনা খাতুন' উনুনে বসতে পারে না, পারে উনুনের পাশে বসতে। আর সামাসোক্তি অলংকারের মাধ্যমে বুদবুদের ওপর প্রাণসত্তা আরোপ করে প্রশ্ন করা যায় কিন্তু বুদবুদের 'নিকটে'(!) প্রশ্ন করা যায় না। তাছাড়া 'ডুমুর ডুমুর চোখ তার' কবিতা বা আরও কিছু কবিতার ছন্দ প্রয়াস কবির ছন্দ দুর্বলতার প্রমাণস্বরূপ, আর 'শিশিরের জিবের ভেতর গুজিয়ে দিলো টেরাকাঁটা মাছ' পঙ্ক্তিটি নির্দিষ্ট কোনও চিত্রকল্পের ইঙ্গিত বহন করে না।
এরকম সাধারণ কিছু চ্যুতি-বিচ্যুতি বাদ দিলে দ্বীপ সরকার একজন সম্ভাবনাময় কবি। তাঁর কবিতায় আছে এক নস্টালজিক ঘোর,
'ছায়াউরুর মাঝখানে মেঘের ছই আগলে ধরলে
আমি মুখ গুজিয়ে ওম চেখে নিচ্ছিলাম; মনে পড়ে।'
মূলত দ্বীপ সরকার কোনও উচ্চকণ্ঠ কবি নন, তার স্বর মৃদু গম্ভীর ও রোমান্টিক এবং অর্থময়। আছে উপদেশ আর ক্ষীণভাবে হলেও অধিবিদ্যা। 'মুখ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে পদ্য এবং পাখির কিচির মিচির' এই তো কবিতা! এমন পঙ্ক্তি যিনি রচনা করতে পারেন তিনিই তো কবি। তবে কবিতায় উপদেশ পামর স্বরূপ, ব্যক্তিগতভাবে আমার পাঠে বিঘ্ন ঘটায়। যদিও রুচিভেদে সেটা খণ্ডিত নয়, সুতরাং আসুন আরও কিছু সম্ভাবনাময় স্তবক পড়ি-
নদীতে পরিচিত হাওয়ারা টোকা দিচ্ছে
আর অদ্ভুত মাছগুলো অপহরণ করে চলেছে নদীর গল্প,
গোসল করতে নামা শিশুটির মাদুলিতে ঝুলছে বেড়ে ওঠা কৌশল
বালিকাদের মনে উপচে পড়ছে খণ্ডিত দৃশ্যের পুরাণ,
মূলত এগুলো আমার কবিতা নাও হতে পারে-
[খসরা এবং প্রস্তুতি বিষয়ক পাঠ]
স্মৃতিরোদে পুড়তে ভালোবাসে বলেই স্মৃতির কাছে ফিরে যায় মানুষ
আদিকাল থেকেই এই পোড়া বিষয়ক খুঁটিনাটি জানা;
বিষণ্নের ব্যাখ্যা থেকে একটু দূরে যেতে চাই
একটু ভিন্ন দিকে- তমাল জারুল চেরা মেঠোপথে
অথচ অবসন্ন আঁকড়ে ধরে আমাকে
পুনশ্চ ফিরে আসি-যেখানে স্মৃতির নোঙর ভিড়ানো,
[শুচিবাই]
ঐতিহ্যের বড়শিতে ঝুলে থাকা শতাব্দীর মাছ,
কার্নিশে নতজানু হয়ে বসে থাকা কুসুম করোটি
আমার প্রতিক্ষায় আছে- ওরা এভাবেই থাকে
[ঘর পলায়ন ইচ্ছেসমূহ]
আমার দাদি সন্ধ্যার আকাশ পানে তাকিয়ে বলতেন-
দেখ্ ঐ চাঁদের কুঁজো বুড়িটা নিরত শুঁটকির মতো ভেঁজে ওঠে
এলোকেশি চুল নাড়িয়ে দেয় চাঁদের মাচানে
[চন্দ্রপুরাণ]
সর্বোপরি কবি বীরেন মুখার্জীর মতো আমিও কবি দ্বীপ সরকারকে কবিতার কারিগর হিসেবে পেতে চাই, তবে তার জন্য পাঠককে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। 'ডারউনের মুরিদ হবো' কব্যে যার স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। আছে সমাজ-জীবন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দেশপ্রেম। তিনি অর্থময়, ইন্দ্রিয়জ অথবা অতিইন্দ্রিয়জ চিত্রকল্প নির্মাণে ঝোক থাকলেও তা এখনও সুনির্দিষ্ট নয়। আশাকরি এই কাব্যপাঠ সকল শ্রেণির পাঠককেই তৃপ্তি দিতে সক্ষম হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই কাব্যের বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করি। জয় হোক কবিতার।
একটু নিরপেক্ষ হতে শেখো'-
আকাশকে মাটিতে নামিয়ে, সম্মুখে দাঁড় করিয়ে কবিরাই বোধহয় এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন। উপদেশও দিতে পারেন, কেননা তিনি কবি, কোনও সাধারণ মানুষ নয়। এটা অবশ্যই মিথ্যে নয়। তবুও এভাবে কবিদের এলিয়েন বানিয়ে ফেলার প্রয়াস কিংবা মহৎ ভাবাটা রাজনৈতিক; পীড়াদায়কও বটে। তবে প্রকৃত কবি অবশ্যই একটি ভিন্ন সত্তা লালন করেন, সাধারণের মাঝে থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠার প্রয়াস পায় তাঁর জীবন ও কাব্যে। কবি দ্বীপ সরকারের কাব্য, 'ডারউইনের মুরিদ হবো' পাঠের পর আমারও তেমনটাই মনে হয়েছে। কারণ জীবনের ভেতর থেকে জীবনকেই বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে খুঁজে ফিরেছেন কবি, যার ভেতরে স্পষ্ট হয়েছে কবির বোধ, নির্মাণ দক্ষতা এবং আত্মপ্রতিকৃতি।
গুহাযুগ থেকে কৃষিনির্ভর ও আধুনিক জীবনে আসতে মানুষকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। যাপনপদ্ধতির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে চিন্তার জগত, ফলত কবিতার ভেতরেও এইসব বিবর্তন লক্ষ করা যায়। তাই বিজ্ঞজন ও বিদগ্ধ পাঠক মনে করেন ইতিহাসের বিশুদ্ধ নির্যাস কবিতার ভেতরেই দৃশ্যমান হয়। সময়ের কবিতায় পাঠক এমন বিশ্ববীক্ষা পছন্দ করেন। কিন্তু ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় অন্য আর এক অভিজ্ঞতার সম্মুখে, প্রমাণ করে দেন মানুষ আসলে স্মৃতিকাতরতা নামক এক রোগে আক্রান্ত। কারণ মানুষ প্রকৃতি সাংঘর্ষিক, বহন করেন দীর্ঘ যাপনাভিজ্ঞতার প্রত্ন, ফলশ্রুত সভ্যতার আড়ালে মানুষকে ভোগ করতে হয় বহু শারীরীক প্রতিবন্ধকতা। কবিরাও এর ব্যতিক্রম নন, কবিরাও যাপন অভিজ্ঞতা, দর্শন, স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত হন, ফলে তাঁদের কবিতাকর্মটিও হয়ে পড়ে একরৈখিক। 'ডারউইনের মুরিদ হবো' কাব্যে কবি দ্বীপ সরকার এমন অভিজ্ঞতাকে সচেতনভাবে অতিক্রম করার প্রয়াস পেয়েছেন, আবার আক্রান্তও হয়েছেন।
এই কাব্যের ভূমিকায় কবি-প্রাবন্ধিক বীরেন মুখার্জী যথার্থই বলেছেন, বিষয় আশয়ের বাসনা থেকে বেরিয়ে যদি ধ্যানি হতে পারেন তবেই কবি দ্বীপ সরকারের মোক্ষ লাভের আশা আছে। তিনি এই কাব্যে ছন্দহীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই কাব্য নিয়ে কিছু লিখতে বসে আমার যখন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ভিন্নভাষার গোলাপজলে'র দ্বারস্ত হতে হয়েছে, তখনই মনে হয়েছে--প্রথম গ্রন্থ থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থে কবি পাঠকদের অন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করতে চেয়েছেন। ফলে কবিতা হয়ে উঠেছে নিরীক্ষাপ্রবন, যার চাপ এসে পড়েছে কবিতার শরীরে। ভাষা, ছন্দ এবং কাঠামোর ওপর। আমি কবিতায় নিরীক্ষার পক্ষে তবে শিল্পের শাশ্বত স্বতঃস্ফূর্ততাকে অক্ষুণ্ন রেখে। কবিদের এই একটাই তো অস্ত্র, 'শব্দবাণ।' কবি দ্বীপ সরকারকে এই 'শব্দবাণ' আরও শাণিত করতে হবে, কেননা তাঁর কবিতায় শব্দজট হয়ত নেই কিন্তু মেদবহুল; বিনির্মাণগত ত্রুটি আছে। নিম্নে আমি এই ধরনের কিছু স্তবক তুলে দিচ্ছি পাঠকের জ্ঞাতার্থে-
এক কুয়াশা সকালে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসলো 'চোখ মোড়ানো' বেজি
বিষাক্ত গোখরা লেজের ওপর দাঁড়ালো এবং
বেজির 'চোখ মুখে' প্রাজ্ঞের বিষ ছুড়ে দিলো-
[বেজি ও গোখরা]
এই বুদবুদের 'নিকটে' একদিন প্রশ্ন করেছিলাম
[বুদবুদ]
তবে 'উনুনে বসা' তহমিনা খাতুন উত্তর দিয়েছিলেন
[ঐ]
উজানে বাড়ি তার- সাঁতার শিখেছি যেতে
অক্টোপাস এসে ঘিরে ফেললো- রক্ত চুষে খেতে
যুদ্ধের ডানা উঁচিয়ে- একাত্তরের গল্প শুনোই
পাতাল থেকে মুক্তো কুড়ানোর অভিজ্ঞতা বুনোই
হেঁচকা দেই, খুলে যায় পাতাসমূহের বল্টু ও নাট
অক্টোপাস মরে গেলো- সাঁতরিয়ে পেরলাম ঘাট
[ডুমুর ডুমুর চোখ তার]
একদিন শিশিরের সাথে বাজখাই আকাশের বিরোধ আঁটে-
চাকচিক্য রৌদ্রের ফেনা ছিটাতে থাকলো
ভোরে শিশিরের মৌন মিছিল আগুনের ফায়ারিং চালালো
‘শিশিরের জিবের ভেতর গুজিয়ে দিলো টেরাকাঁটা মাছ’
অন্য ভাষার ছেদ চিহ্ন-
[শিশির আর ঘাসখেকো গাভী]
চোখ মোড়ানো বেজি 'শব্দবন্ধ' আমার সম্মুখে কোনও স্পষ্ট চিত্র কিংবা চিত্রকল্প নয়, কারণ এমন শব্দবন্ধ আমার অপরিচিত এবং দুর্বোধ্য কিংবা 'চোখ মুখে' না হয়ে হতে পারতো 'চোখেমুখে'। হয়ত এ আমার নিজেরই অক্ষমতা! তবে 'এই বুদবুদের নিকটে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম' কিংবা 'উনুনে বসা তহমিনা খাতুন' এর মতো পঙ্ক্তি অবশ্যই ভুল। কারণ 'তহমিনা খাতুন' উনুনে বসতে পারে না, পারে উনুনের পাশে বসতে। আর সামাসোক্তি অলংকারের মাধ্যমে বুদবুদের ওপর প্রাণসত্তা আরোপ করে প্রশ্ন করা যায় কিন্তু বুদবুদের 'নিকটে'(!) প্রশ্ন করা যায় না। তাছাড়া 'ডুমুর ডুমুর চোখ তার' কবিতা বা আরও কিছু কবিতার ছন্দ প্রয়াস কবির ছন্দ দুর্বলতার প্রমাণস্বরূপ, আর 'শিশিরের জিবের ভেতর গুজিয়ে দিলো টেরাকাঁটা মাছ' পঙ্ক্তিটি নির্দিষ্ট কোনও চিত্রকল্পের ইঙ্গিত বহন করে না।
এরকম সাধারণ কিছু চ্যুতি-বিচ্যুতি বাদ দিলে দ্বীপ সরকার একজন সম্ভাবনাময় কবি। তাঁর কবিতায় আছে এক নস্টালজিক ঘোর,
'ছায়াউরুর মাঝখানে মেঘের ছই আগলে ধরলে
আমি মুখ গুজিয়ে ওম চেখে নিচ্ছিলাম; মনে পড়ে।'
মূলত দ্বীপ সরকার কোনও উচ্চকণ্ঠ কবি নন, তার স্বর মৃদু গম্ভীর ও রোমান্টিক এবং অর্থময়। আছে উপদেশ আর ক্ষীণভাবে হলেও অধিবিদ্যা। 'মুখ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে পদ্য এবং পাখির কিচির মিচির' এই তো কবিতা! এমন পঙ্ক্তি যিনি রচনা করতে পারেন তিনিই তো কবি। তবে কবিতায় উপদেশ পামর স্বরূপ, ব্যক্তিগতভাবে আমার পাঠে বিঘ্ন ঘটায়। যদিও রুচিভেদে সেটা খণ্ডিত নয়, সুতরাং আসুন আরও কিছু সম্ভাবনাময় স্তবক পড়ি-
নদীতে পরিচিত হাওয়ারা টোকা দিচ্ছে
আর অদ্ভুত মাছগুলো অপহরণ করে চলেছে নদীর গল্প,
গোসল করতে নামা শিশুটির মাদুলিতে ঝুলছে বেড়ে ওঠা কৌশল
বালিকাদের মনে উপচে পড়ছে খণ্ডিত দৃশ্যের পুরাণ,
মূলত এগুলো আমার কবিতা নাও হতে পারে-
[খসরা এবং প্রস্তুতি বিষয়ক পাঠ]
স্মৃতিরোদে পুড়তে ভালোবাসে বলেই স্মৃতির কাছে ফিরে যায় মানুষ
আদিকাল থেকেই এই পোড়া বিষয়ক খুঁটিনাটি জানা;
বিষণ্নের ব্যাখ্যা থেকে একটু দূরে যেতে চাই
একটু ভিন্ন দিকে- তমাল জারুল চেরা মেঠোপথে
অথচ অবসন্ন আঁকড়ে ধরে আমাকে
পুনশ্চ ফিরে আসি-যেখানে স্মৃতির নোঙর ভিড়ানো,
[শুচিবাই]
ঐতিহ্যের বড়শিতে ঝুলে থাকা শতাব্দীর মাছ,
কার্নিশে নতজানু হয়ে বসে থাকা কুসুম করোটি
আমার প্রতিক্ষায় আছে- ওরা এভাবেই থাকে
[ঘর পলায়ন ইচ্ছেসমূহ]
আমার দাদি সন্ধ্যার আকাশ পানে তাকিয়ে বলতেন-
দেখ্ ঐ চাঁদের কুঁজো বুড়িটা নিরত শুঁটকির মতো ভেঁজে ওঠে
এলোকেশি চুল নাড়িয়ে দেয় চাঁদের মাচানে
[চন্দ্রপুরাণ]
সর্বোপরি কবি বীরেন মুখার্জীর মতো আমিও কবি দ্বীপ সরকারকে কবিতার কারিগর হিসেবে পেতে চাই, তবে তার জন্য পাঠককে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। 'ডারউনের মুরিদ হবো' কব্যে যার স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। আছে সমাজ-জীবন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দেশপ্রেম। তিনি অর্থময়, ইন্দ্রিয়জ অথবা অতিইন্দ্রিয়জ চিত্রকল্প নির্মাণে ঝোক থাকলেও তা এখনও সুনির্দিষ্ট নয়। আশাকরি এই কাব্যপাঠ সকল শ্রেণির পাঠককেই তৃপ্তি দিতে সক্ষম হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই কাব্যের বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করি। জয় হোক কবিতার।
কবির মুকুল প্রদীপ
কবি-সমালোচক, নাট্যকর্মী ও ডান্স কোরিওগ্রাফার।
তারাগঞ্জ বাজার, নালিতাবাড়ি, শেরপুর।
ইমেইল-kobirmukul2222@gmail.com
ফোন নং ০১৯২৯৪৭৯৯৪৩
সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৯
হাইপাররিয়েলিটি ও উত্তর-আধুনিক
বাস্তব বলে কিছু নেই। যাকিছু দৃশ্যমান তাকে বাস্তবের ছল বলেছেন বদ্রিয়ার। যেমন ধরুন উত্তর-আধুনিক কালের বিজ্ঞাপন, পণ্যের চেয়েও অধিকতর বাস্তব রূপে প্রদর্শিত হচ্ছে বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেক দার্শনিক। অথবা কোনও সেলিব্রিটি যে জীবনযাপন করেন, তিনি চাইলেও আর প্রকৃত বাস্তবতার সাথে কোনও সম্পর্ক রাখতে পারেন না তার বায়বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। কিংবা ওই সেলিব্রিটির কোন ভক্ত যখন কল্পনায় তার যাপনপদ্ধতি ফলো করেন, তাকে বলে কৃত্রিম বাস্তবতা অথবা হাইপাররিয়েলিটি। এই আরোপিত বাস্তবতা যে কেবল আধুনিকোত্তর কালে দৃশ্যমান হয়েছে এমন কিন্তু নয়, খ্রিস্টপূর্ব গ্রিক কবি ও কাব্যতাত্ত্বিক হোরেস তাঁর আর্স পোয়েটিকায় যে আলোচনা করেছিলেন, পরবর্তিতে নিও ক্লাসিসিজম যে সাহিত্যের ভিত্তিস্থাপন করেছিলো, ঠিক তেমনটা। কিংবা দান্তে যেভাবে খ্রিস্টানকে মহৎ প্রমাণ করেছেন তাঁর 'ইনফার্নো' কাব্যে তারই অনুরূপ। কিন্তু সময়ের চক্রব্যূহে এইসব মহত্ত্ব আজ আর টিকে নেই, তবে কব্যসুসমা ও ভাষাসম্মন্ধীয় কিছু কিছু তত্ত্ব আজও অনস্বীকার্য সেসকল তত্ত্ব ও সাহিত্যের।
হোরেস তাঁর এই পত্রকাব্যের শুরু করেছিলেন এক চিত্রকরের আঁকা একটি উদ্ভট চিত্রের বিশ্লেষণ দিয়ে এবং শেষ করেছিলেন ততোধিক কিদ্ভূত এক কবির জীবনাচারের ব্যাখ্যা দিয়ে। যে চিত্রশিল্পী আঁকতে বসে এঁকেছিলেন কিদ্ভূতদর্শন এক জানোয়ারের ছবি, যার চেহারাটা ঘোড়ার মতো হলেও মুখটা মানুষের এবং পেছনদিকে লেজের বদলে পাখির পালকের ন্যায় রংবেরঙের পালক। আর কবির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন এক ক্ষ্যাপাটে কবির কথা, যে কবি কাব্যসাধনার চেয়ে কবি কবি ভাব প্রকাশেই বেশি কৌতূহলি। সে কাব্যজনোচিত ব্যবহারবিধি জাহির করতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এবং চিৎকার করে কবিতা আওড়াতে আওড়াতে রাস্তা হাঁটে আর উড়ন্ত একটি কালো পাখিকে দেখে তার মাংস খাবে বলে তাড়া করতে করতে পড়ে যায় গাড্ডায়। ফলশ্রুত এই কবি যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কবিতা আওড়িয়েছে তখন একে দেখে তামাশা করেছে বাচ্চারাও আর গাড্ডায় পড়ে শত চিৎকার করেও সংবেদনা জাগাতে সক্ষম হলো না কোন সহনাগরিকের।
হোরেস তাঁর তত্ত্বে কাব্যে কতটুকু ছাড় দেয়া উচিত কবিদের সে বিষয় নিয়েও কিছু তাত্ত্বিক আলোচনা করেছিলেন, 'বলেছিলেন এটা পাঠককেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।' বোঝা যাচ্ছে কাব্যে কিরূপ শৃঙ্খলের কথা বলতে চেয়েছেন হোরেস, উদাহরণ স্বরূপ তিনি হোমারকে অনুকরণের কথা বলেছিলেন সমকালীন কবিদের। সুতরাং ধারণা করতে পারি গ্রিক মাইথলজির মহত্ত্ব বিনির্মাণকেই উৎকৃষ্ট কাব্যের আখ্যা দিতে চেয়েছিলেন হোরেস, পক্ষান্তরে একেই বলা যায় বায়বীয় বাস্তবতা; যা নেই ভবে তার অস্তিত্ব কল্পবাস্তবতায় অধিকতর বাস্তব অথবা মহৎ রূপে টিকে আছে বা থাকে। এই গল্প বানানোর ক্ষমতাই হোমো সেপিয়েন্সদের সভ্যতার পথ প্রসারিত করেছে বলে মনে করেন বহু নৃতাত্ত্বিক।
আর ইনফার্নো'য় দান্তে করেছেন নরকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, দেখিয়েছেন কীভাবে পাপের স্খালন করছেন তুলনামূলক খ্রিস্টীয় রীতিবিদ্বেষীরা। যেখানে সাঁজা ভোগ করতে দেখা যাচ্ছে সক্রেতিস, প্লেটো, এরিস্টটল, মোহাম্মদ (সা.)সহ খ্রিস্টীয় মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে যে সকল তাত্ত্বিক, দার্শনিক ভিন্ন মত তৈরি করতে চেয়েছেন। এরই একটা রূপ হচ্ছে পাশ্চাত্যের প্রাচ্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বলেছেন এডওয়ার্ড সাঈদ। ফলত প্রত্যেক ইউরোপীয় মনে করে প্রাচ্য হচ্ছে তন্ত্র-মন্ত্র-ঝাড়-ফুঁক-তাবিজ-কবজ তাই প্রাচ্যের মানুষের ওপর তাদের আধিপত্য ঈশ্বরপ্রদত্ত। সুতরাং জন্ম নেয় সাম্রাজ্যবাদী ধারণা, যা পরবর্তিতে সুপরিকল্পিতভাবে আরোপিত হয় প্রাচ্যের ওপর। যাকে বলে আধুনিক অথবা যন্ত্রসভ্যতা কিংবা সভ্যতা। এই আধুনিকতার নামে পাশ্চাত্য প্রাচ্যকে দখল করে, এবং চাপিয়ে দেয় তাঁদের মহৎ সংস্কৃতি(বায়বীয় খ্রস্টীয় রীতি) পক্ষান্তরে শোষণ ও লুণ্ঠন করে।
কিন্তু প্রাচ্যের মানুষের আছে লক্ষ লক্ষ বছরের যাপন অভিজ্ঞতা, চাইলেই তো আর তা রাতারাতি বদল করা সম্ভব না; তাছাড়া ইউরোপীয়দের মতে এইসব অলস ও কল্পনাবিলাসী মানুষ খুব সহজে বদলাতে চায় না, তাদের মন খোলা মাঠে পায়খানা করে যতটা তৃপ্ত হয়, মোজাইক করা বাথরুমে ততটা নয়। কিন্তু এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর প্রাচ্যতত্ত্ব গ্রন্থে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সহযোগে দেখিয়েছেন, কোন কালে প্রাচ্যের ক্ষমতা ছিলো পাশ্চাত্যকে শাসন করার। তিনি ইস্কাইলাসের নাটকের ভেতর থেকে খুঁজে বের করেছেন সেই সম্ভাবনা। তাছাড়া তিনি খ্রিস্টীয় জার্মানি সর্বেশ্বরবাদ থেকেও মুক্ত করেছেন উপমহাদেশের আধ্যাত্মবাদী সংস্কৃতিকে।
ওদিকে ফ্রয়েড, ইয়ুং, লাঁকা, ফুকো হয়ে জার্মানি চিন্তক নিৎশে ঘোষণা করেন, 'ঈশ্বরের মৃত্যু।' জর্জ বাতাই-এর মতো তাত্ত্বিক লিখলেন Story of the Eye নামে এমন একটি উপন্যাস যা খ্রিস্টীয় রীতিনীতির সকল সীমা লঙ্ঘন করে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিলো স্বয়ং ইউরোপীয়ানরা তাকে ব্যাখ্যা দিলো পর্নোগ্রাফি বলে। ধারণা করি উপমহাদেশের যৌনরাজনীতিকে অতিক্রম করে এই উপন্যাস পাঠযোগ্য হতে আরও কয়েক শ বছর লাগতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই মূলত তথাকথিত আধুনিকতার অবক্ষয়গুলো ইউরোপ জুড়ে দৃশ্যমান হতে থাকে। সত্তরের দশকে এসে মার্ক্সবাদ ও আধুনিকবাদকে সমালোচনা করার নামে পূর্ণতা পায় আর একটি নতুন মতবাদ পোস্টমডার্ন, যে কিনা মিডিয়াসর্বস্বতাকে ব্যবহারে সক্ষম, মানে হাইপাররিয়েলিটিকে ধরতে সক্ষম। পোস্টমডার্ন একদিকে আধুনিকতাকে অতিক্রম করতে চায় অন্যদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অনুসন্ধান করতে ফিরে যায় মধ্যযুগে। ফলশ্রুত গোটা ইউরোপ জুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ফান্টামেন্টালিজম। ভুলে গেলে চলবে না, উত্তর-আধুনিক শব্দটির অনেকগুলো অর্থের ভেতর একটা হচ্ছে ধর্মীয় পুনর্জীবন।
যে ফান্টামেন্টালিজম ভারতের শেকড়েও সূক্ষ্মভাবে প্রোথিত। গণতন্ত্রের নামে তাদের এতোদিনের যে ভাঁড়ামো, মিডিয়াসর্বস্বতায় এসে তা মৌলবাদে পর্যবতিস হয়। কেননা মিডিয়ার ভয়ংকর যে দিকটা আছে তা হচ্ছে প্ররোচনা, এরা তুচ্ছ কোন ঘটনাকেও এমনভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম যে; সাধারণ কোন ঘটানাই কুড়িয়ে নেয় নাগরিক সংবেদনা আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পড়ে যায় ধামাচাপা। মূলত এই মিডিয়ার বদৌলতে ভারত জাতিয়তাবাদের নামে যে চর্চা করেছে এক পর্যায়ে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মৌলবাদ। যা ইউরোপের পরবর্তী সংস্করণ বলা চলে। এমতবস্থায় বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের তো আর চুপ থাকা চলে না! কারণ বাঙালিদের অধিকার যে এতে খর্ব হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই তাঁরাও এতোদিনের আমদানিকৃত আধুনিকতার ওপর খড়্গহস্ত হলেন। কাঁচের ভেঙে যাওয়া আয়নার মতো যখন বিচূর্ণ হলো আধুনিকতা। কেবল তখনই বাঙালি সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা বুঝতে পারল বিচূর্ণ আয়নার খণ্ডিত অংশ থেকে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য উদ্ধারও হয়ে পড়েছে দুরূহ।
বাঙালি তাত্ত্বিকেরা এবার ভাবনায় পড়লেন! তাঁদের সম্মুখে তখন হাতছানি দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের পোস্টমডার্ন তত্ত্ব। ইতোমধ্য সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম পাশ্চাত্যের জারিজুরি কিছুটা স্পষ্ট করেছে। সুতরাং পোস্টমডার্ন গ্রহণ ও সাপের লেজে পা দেয়া সমান বুঝে হাংরি খ্যাত কবি মলয় রায় চৌধুরী ও তাঁর ভাই সমীর রায় চৌধুরী এবং সমসাময়িক আরও কিছু কবি-সাহিত্যিক মিলে ইউরোপীয় পোস্টমডার্নের বাঙালিকীকরণ করলেন উত্তর-আধুনিক নামে। সমস্তরকম আদর্শবাদ ভেঙে দেয়াই হচ্ছে এই তত্ত্বের মূল, যে আদর্শ গঠিত হয়েছে মহৎ কিছু বায়বীয় ধারণা থেকে যেমন আধুনিকতা, মার্ক্সবাদ, ধর্ম। কিন্তু এই তত্ত্ব যেহেতু অতীত অনুসন্ধানের দিকে ঝোঁকে তাই বাংলাদেশে এসে এই তত্ত্ব আর একটু বিকৃত হয়ে, হয়ে উঠলো মৌলবাদীদের হাতিয়ার। উত্তর-আধুনিকের নামে একশ্রেণি কবি-সাহিত্যিক ধর্মীয় আদর্শ উদ্ধারে লেগে গেলেন, ফলে প্রাণ পেল স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরে একটু গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই যে ধর্মপ্রাণ বাঙালি চোখে পড়ে, এরা বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত এই হাইপাররিয়েলিটির কবলে পড়ে। ধর্মীয় আধিপত্যবাদী যুক্তহীন যুক্তি ছাড়া তাদের সামনে কোন মানবিক আদর্শের ভিত্তি নেই। এইসব ধর্মঅন্তপ্রাণ সরল মানুষের ওপর খুব সহজেই আরোপ করা যায় লুটের সংস্কৃতি, ফান্টামেন্টালিজম। তো নতুন নতুন বলে উত্তর-আধুনিক-এর নামে হতাশ ও লোভী কিছু কবি-সাহিত্যিক-তাত্ত্বিকরাও শুরু করে দিলো লুটপাট আর দ্রুতই নাগালে এলো পদ-পদবী-অর্থ-কড়ি। এখন ঘটনা হচ্ছে, সাহিত্য ও কবিতার নামে আপনিও কি লুটপাট এবং পদ-পদবী হাতাবেন নাকি বিভ্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পথ দেখাবেন-- সেটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করেনি ও করে না।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ
'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দ...
-
কেবল ছোটগল্পের পাঠকই বোধকরি এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, একটি গল্পপাঠ শেষে আরও অনেকগুলো গল্পের বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠেন। গল্পকারও ...
-
মজার ব্যাপার হলো লাতিন আমেরিকায় যখন 'লো রেয়াল মারাভিঝোসে' [আশ্চার্য বাস্তব] রচনারীতি কিংবা মধ্য যুগের বারোকরীতি অবলম্বন করে লেখা হচ্...
-
ভুল বুঝবেন না! আসলে বলতে চেয়েছি, উত্তরাধুনিককালে মানুষের মাংস খাওয়ার ধরন কিংবা রূপান্তরটা কেমন হয়েছে। আদৌ কী মানুষ মানুষের মাংস খায়? গল্পগ্র...
-
'এই একঘেয়েমি বিরুদ্ধাচার কেন? সহনশীল হলে ক্ষতি কি হে দাপুটে আকাশ? একটু নিরপেক্ষ হতে শেখো'- আকাশকে মাটিতে নামিয়ে, সম্মুখে দাঁড় করি...


