আমি একজন সাহিত্যের পাঠক মাত্র; ভালোবাসা থেকে তাই প্রিয় লেখক কবিদের বই নিয়ে পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখার চেষ্টা করে থাকি। ফলত ভাবলাম, এটা বরং সকলের সাথে শেয়ার করা যাক, তাই এই ব্লগের প্রয়াস_আশা রাখি সকলেই পাশে থাকবেন।
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০
বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির একালসেকাল
মানুষ যে মানবিক গুণাবলি নিজের ওপর আরোপ করেছে তার মূলে রয়েছে ভাষা, ভাষা ছাড়া মানুষকে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীর থেকে আলাদা করার কোনো বাস্তবতা নেই। এইটা একটা বহু চর্বিত বিষয়, কিন্তু ভাষা যেহেতু প্রতিমুহূর্তে বিনির্মিত হয়, ভাষাকে বিনির্মাণ করার ক্ষমতা যেহেতু মানুষের ভ্রূণাবস্থাতেই মস্তিষ্কের কোষ ক্রোমোজমে প্রতীকী রূপে অবস্থান করে, ফলত প্রতিটি মানব সত্তা সেই ভাষাসৃষ্ট প্রতীকগুলোকে নিজ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব ভাষার জগত, প্রকাশ করেন অনুভূতি, গড়ে তোলেন সামাজিক পরিচিতি। সহজ করে বলতে হলে, প্লেটোর অনুকরণ তত্ত্ব ও হাইডেগার কথিত মৌল এবং পতিতসত্তা থেকে কিছু ঋণ নিতে হয়। দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, কবি-শিল্পীরা ঈশ্বর সৃষ্ট প্রকৃতির অনুকরণ করেন ফলে কবিদের বাস্তবতা তৃতীয় বাস্তবতা যার সত্যাসত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্লেটো। এরিস্টেটল এই অনুকরণকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলেই মনে করতেন। মানুষ মূলত ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই প্রকৃতি ও পরিপার্শ্ব থেকে অনুকরণ করে, এবং এটাই স্বাভাবিক। এই অনুকরণ অথবা যুগ্মবৈপরীত্য হাইডেগার কথিত দুটো সত্তায় ভাগ হয়ে যায়, যাকে তিনি বলেছেন মৌল ও পতিত অর্থাৎ ভালো ও মন্দ।
এই ভালো ও মন্দ দেরিদার বিনির্মাণ তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লষণ করলে সবটাই ভেঙে পড়বে, মানে আপেক্ষিক। তথাপি আমরা ভালো বলতে এখানে সেটাই বুঝবো যেটা পৃথিবী ও প্রকৃতির জন্য কল্যাণকর; পৃথিবী ও প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন হলে বুঝবো মন্দ। মানুষ তার পরিপার্শ্বিক তথাকথিত ভালো ও মন্দকে অনুকরণ করে গড়ে তোলে যুগ্মবৈপরীত্য; ঘোষণা করে মৌল এবং পতিত সত্য-মিথ্যার পরিচিতি। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, ভাষাকে কেন্দ্র করে মুনুষ্য সমাজে যে ভালোমন্দ, নীতিনৈতিকতাবোধ পতিষ্ঠা হয়েছিল তার মূলে রয়েছে ধর্ম। ধর্মই আমাদের শিখিয়েছে এটা করা উচিত এবং এটা অনুচিত। যেহেতু ধর্মগুলো সব পুরুষতান্ত্রিক তাই পরিবার কেন্দ্রিক যে সমাজবাস্তবতা তাকে আমরা পিতা অথবা প্রভুত্ববাদী বলতে পারি। জাক লাকাঁ তাই এই প্রভুত্ববাদী সমাজে ভাষাদ্বারা নির্মিত প্রতীকগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে যে, 'বাবা-মা, খালা-খালু, ভাই-বোন এ ধরনের নামকরণের অর্থই হলো একজন ব্যক্তি-একককে বুঝিয়ে দেয়া, কার সাথে যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে এবং কে যৌন-সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।'
দূর অতীতে শিকারী সংগ্রাহক যুগে এই হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির ভেতর সম্পদ কুক্ষিগত করার ধারণা জন্মে নারীকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ গোষ্ঠীবদ্ধোভাবে জীবনযাপন করা মানুষের একজন গোষ্ঠীপতি থাকতো, তিনি ক্ষমতাবান, শিকারে দক্ষ হতেন। ফলত এই পতির ভোগ্যপণ্য হিসেবে অধিকারে থাকতো একাধিক নারী; কালক্রমে এই পতির পতন হতো দলেরই কোনো অন্য ক্ষমতাবান পুরুষের দ্বারা এবং অধিকৃত নারীদের সাথে দখল নিতেন প্রভুর অবস্থান। এভাবেই ধীরে ধীরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় পিতা কেন্দ্রিক সমাজ বাস্তবতা এবং পিতার দ্বারা আরোপ হয় ন্যায়নীতি বোধ, তারই প্রত্ন আজও আমাদের অবচেতনে প্রবহমান। ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব মূলত এইসব ন্যায়নীতি বোধের দাসত্বে মানব মনে যে অবদমন তাকে কেন্দ্র করেই। কারণ এটা ভালো, ওটা মন্দ, এটা আমার, ওটা তোমার মতো ন্যায়নীতিবোধ মানব মনে জন্ম দিয়েছে একধরনের যৌন-অতৃপ্তি, যা ভাষাপ্রতীকের মাধ্যমে সুপ্তাবস্থায় রক্ষিত আছে অচেতনে। ফ্রয়েড যাকে বলেছেন ইডিপাস কম্পেলেক্স, ইলেক্টা কম্পেলেক্স, লিঙ্গকর্তনভীতি, লিঙ্গহীনতা জনিত ভয়। ফ্রয়েডের বক্তব্যানুযায়ী মানব মনে এই অতৃপ্ত বাসনা ঘুমন্তবস্থায় স্বপ্নপ্রতীক রূপে ধরা দেয়, যে স্বপ্ন খ-িত এবং এলোমেলো অধিবিদ্যাজাত। এই অবদমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে অর্থাৎ অবচেতন দ্বারা সচেতন সত্তা পরাজিত হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা হয়। ফ্রয়েডের এই স্বপ্নপ্রতীকের বিশ্লেষণ করেই মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের চিকিৎসায় এক অভিনব পদ্ধতির আবির্ভাব হয় যা মূলত ভাষাদ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে।
ফ্রয়েড পরবর্তী ভাষা দর্শনে আজ অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু ফ্রয়েডকে পুরোপুরি বাতিল করে নয় বরং সকলেই ফ্রয়েডের কাছে ঋণস্বীকার করেছেন। এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় সেসব নয়, তথাপি কাব্য-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার আগে এইসব চর্বিতচর্বণ আর একবার চাবিয়ে নিলাম। বাংলা সাহিত্যে মূলত এইসব অবদমনকে কেন্দ্র করেই, তবে হাইডেগার কথিত পতিত ও মৌল দুটো সত্তারই প্রকাশ দৃশ্যমান। যথা চর্যাপদের কবিদের দ্বারা রচিত পদকে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা সম্ভব। আমরা চর্যায় যে পদ পড়েছি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায় যাকে বলে সান্ধ্যভাষায় রচিত পদ, কতক বোঝা যায়, কতক বোঝা যায় না; মানে একটা আড়াল তৈরি করা হয়েছে, রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তখনকার বাস্তবতায় সবকিছু সোজাসাপটাভাবে বলার অধিকার ছিলো না, ক্ষমতাদ্বারা আরোপিত আইন সমাজে যে বাস্তবতার সত্যমিথ্যা গড়ে তুলেছিলো সেখানে খোলাখুলিভাবে সবকিছু বলা ছিলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধর্মকেন্দ্রিক বাস্তবতায় যে আইন ঈশ্বর প্রদত্ত, উপমহাদেশের ধর্মগ্রন্থগুলোতে এমন দৃষ্টান্ত ভুঁড়িভুঁড়ি। যথা সংস্কৃত বৃহন্নলা শব্দটির ব্যবহার আমরা মহাভারতে পাই, সামান্য লৈঙ্গিক ত্রুটির কারণে মানুষ হয়ে, মানুষের ভেতরে থেকেও তাঁদের ওপর এই অধিবিদ্যাজাত শব্দটিকে আরোপ করার ফলে আজও হিজরেদের দুর্বিষহ জীবন আমরা স্বাভাবিক মনে করি, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি হচ্ছে আমাদের কোষ ক্রোমোজমে এইসব প্রভুত্ববাদী শব্দদ্বারা আরোপিত বাস্তবতা এখন রক্ষিত আছে, ভাষাপ্রতীকের মাধ্যমে। একারণে চর্যাপদ মৌলিক হলেও ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্য আজ আর ততটা মৌলিক নয় ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে।
শব্দ যেহেতু কোনো ধ্রুব সত্যমিথ্যার প্রকাশ করে না তাই ভাষা দার্শনিক দেরিদা একে মুক্তক্রিয়া এবং বিনির্মাণযোগ্য বলেছেন; তিনি ভাষা থেকে অধিবিদ্যাজাত সংশয় দূর করতেও চেয়েছিলেন। আমরা আবার একটু পেছনে ফিরে দেখে নিতে পারি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অধিবিদ্যাজাত ভাষার ব্যবহার করে কীভাবে আপামর জনগণকে শোষণ করুছে ক্ষমতাসীনেরা। বাংলায় ব্রাহ্মণবাদী বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার পর, তারা(ব্রাহ্মণরা) বলতেন, 'কোনো ব্রাহ্মণ যদি কুকর্মে লিপ্ত থাকে কিংবা যদি অশিক্ষিতও হয়, তবুও তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে হবে।' কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করতেন, 'নীচু জাতে জন্ম হওয়া মানে হচ্ছে পূর্বজন্মের কোনো পাপের অভিশাপ, ফলত ইহজন্মে ব্রাহ্মণসেবায় তোমাদের পুনর্জন্মে ব্রাহ্মণঘরে জন্ম মিললেও মিলতে পারে।' ব্রাহ্মণারই তৎকালীন সমাজে জাতপাত-উচুনীচু-বর্ণ-গোত্রের ভেদাভেদ গড়ে তুলেছিল বাঙালি মানসে। বঙ্কিমী সাহিত্যে আমরা এই লক্ষণ দেখতে পাই, রবীন্দ্রসাহিত্যও একেবারে মুক্ত ছিলো না। আমরা যদি মধ্যযুগীয় প্রবাদ-প্রবচনগুলো পড়ি, তার ভেতরেও এইসব লক্ষণ খুঁজে পাবো। বাংলায় মুসলিম শাসকেরা আসার পর ধীরে ধীরে নিপীড়িত বাঙালিরা মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তারিত হতে থাকেন, পর্যায়ক্রমে সংখ্যাটা প্রায় সমান-সমান হয়ে দাঁড়ায়। ব্রাহ্মণবাদী বৈষম্যগুলো কালক্রমে সাম্প্রদায়িক রূপ লাভ করে, ফলত ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন দেশের সূচনা হয় কিন্তু পাকিস্তানদ্বারা চাপিয়ে দেয়া উর্দুভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে না বাঙালিরা, কেবল ধর্মই তাদের বেঁধে রাখতে ব্যর্থ হয়।
এর কারণ হচ্ছে বাঙালিরা যতই ডিভাইটেড হোক না কেন তাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা এবং প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। তথাপি যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দুই ধরনের সাহিত্য লক্ষ করি, যথা মুসলমান বাঙালি সাহিত্য এবং বাঙালি মুসলমান সাহিত্য। এই দুইশ্রেণির মানুষের মানসিক অবদমন বুঝতে হলে আমাদের আবার একটু প্রত্নতত্ত্বের দ্বারস্ত হতে হবে। প্রস্তর যুগে বাঙালিরা সাম্যবাদী ছিল, জাত-ধর্ম-বর্ণ জাতীয় সাম্প্রদায়িকতা আমাদের প্রস্তর যুগীয় পূর্বপুরুষদের ভেতর ছিল না; এমনটা ধারণা করা হয়। ব্রাহ্মণদের হাত ধরেই এই জাত-পাত জনিত ভেদাভেদ শুরু হয়, পরবর্তীতে ইসলাম শাসনামলে যে নব্য-ইসলামী গোষ্ঠীর জন্ম হয়; যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে তারা তাদের বাঙালি অস্তিত্ব অস্বীকার করে, আরবি-পার্শি-তুর্কি ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রধান্য দিতে শুরু করে, ফলত তাদের কাছে জাতীয়তার প্রশ্নে উত্তর আসে, 'আমরা মুসলমান বাঙালি।' এই মুসলমান বাঙালিগোষ্ঠীদের দ্বারা রচিত সাহিত্য মূলত সংস্কৃত ও হিন্দুত্ববাদী সাহিত্য বিরোধী। পক্ষান্তরে তারা বলেন, শব্দে যেহেতু সাম্প্রদায়িকতা নেই তাই বাংলাদেশি সাহিত্যকে কোলকাতা কেন্দ্রমুক্ত করতে হলে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে প্রাধান্য দিতে হবে, ফলত এই শ্রেণির কাব্যগ্রন্থের নাম হয়, বাদ মাগরিব, নুর নুর বলে চমকায় পাখি ইত্যাদি। দার্শনিক জাক লাকাঁর দর্শনানুযায়ী মানুষের অবচেতন হচ্ছে ভাষা-শৃঙ্খলে তৈরি, একারণে একটি মানুষ সবসময় ভাষার রূপক ও প্রতীক সৃষ্টির মাধ্যমে তার অবদমিত অবচেতনকে প্রকাশ করতে চায়। মুসলিম বাঙালিদের দ্বারা রচিত সাহিত্য তাই নৃতাত্বিক কারণেই হয়ে ওঠে হিন্দু বিদ্বেষী যেটা ব্রাত্য রাইসুর ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো পড়লেই বোঝা যায়।
বাঙালি মুসলমান অথবা বাঙালি পরিচয়ে যে সকল কবি-লেখকগণ বর্তমানে বাংলাদেশি সাহিত্যে অবদান রাখছেন, তারা মূলত বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা চায়। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যথা বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক মুজিব ইরম, তার কবিতায় আমরা দেখতে পাই প্রস্তর যুগীয় সাম্যবাদ ও বাঙালি সহজিয়া সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করার প্রয়াস, গল্পকার-অনুবাদক-প্রাবন্ধিক মোজাফ্ফর হোসেন তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন এই বলে যে, 'ছোট বেলায় আমরা, বন্ধুরা মিলে লাল পিপড়ে মারতাম-মানে লাল পিপড়ে হচ্ছে হিন্দু; কেন মারতাম জানি না।' তিনি এই সংস্কৃতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে এসেছেন? লড়াইটা কেমন ছিল? প্রশ্নে ফুটে ওঠে পরিবারতন্ত্রকে ভেঙে একটি সত্তার বৈশ্বিক হয়ে ওঠার গল্প। কবি সরদার ফারুকের কবিতায়ও আমরা এমন বাস্তবতা লক্ষ করি। বলে রাখা ভালো, এই প্রবন্ধে সাহিত্যের শিল্পগুণ বিচার হচ্ছে না, কেবল বাংলাদেশে সক্রিয় দুটো সাহিত্য ধারার তুলনামূলক আলোচনা হচ্ছে। ফলত শিল্পমাণ বিচার এখানে অযৌক্তিক। এই বাঙালি মুসলমান অথবা বাঙালি লেখকশ্রেণির বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে হিন্দুপ্রীতির? আসলেই কী তাই? এই প্রশ্নেরও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে। পুস্কর দাশগুপ্ত বলেছেন, 'অনেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, ভাষা, ধর্ম আচার-বিচার ইত্যাদি ব্যবধান পেরিয়ে সারা ভারতে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো সাধারণ চারিত্রিক লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য যদি থেকে থাকে তাহলে তা হল ভ-ামি। ভারতীয় (বাঙালি বলে আলাদা না করে) সমাজের সর্বস্তরে ভ-ামির অবাধ রাজত্ব আর ভ-ামি এই সনাতন দেশে সর্বধর্মসম্মত, সমস্ত স্মৃতি এবং নীতিশাস্ত্র অনুমোদিত। ধর্মবাক্য, নীতিবাক্যের আড়ালে চুরি, ফেরেব্বাজি করে যাও, ভেজাল দাও, কালো পয়সার পাহাড় বানাও,আড়াল থাকলেই হল। স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য, ব্যক্তিগত সুবিধা বা কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, খুন জখম, জাল জুয়াচুরি, কালোবাজারি সব করে যেতে পারো। তবে তারপর তুমি যদি ঘটা করে তেত্রিশ দেবতার পুজা দাও, হজ করে আসো, মন্দির, মসজিদ কি গির্জা বানাও তাহলেই সমাজ, জাতি, ধর্ম তোমাকে বাহবা দেবে, মাথায় তুলে নাচবে।' { দুশ্চিন্ত দুর্ভাবনা, কলিকাতা ১৯৯৫}
মোটাদাগে বাঙালি হচ্ছে ধর্মান্ধতার লেবাসে ন্যায়নীতিহীন। এর কারণ হল অস্তিত্ব সংকট; ব্রাহ্মণ্যবাদী জাত-পাত ভেদাভেদ, সামন্তবাদী নিপীড়ন, মুঘল-পাঠান-ইংরেজ শোষণ, দেশভাগ, স্বাধীন বাংলাদেশে কোথাও বাঙালি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে না। কেননা জাতি বিভ্রান্ত, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত লালন ফকিরের দুটো গানের ডায়রি পড়তে নিয়ে আর ফেরৎ দেয়নি, এটা মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে এই ভূখ-ে মুসলমান, মুসলমান বাঙালি কিংবা বাঙালি মুসলমানের আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কেবল বাঙালি সুতরাং মক্কা-মদিনায় শেকড় না খুঁজে, খুঁজতে হবে এই ভূখ-ে, যেখানে আমাদের দ্রাবিড় (অথবা আপনি যেটা মনে করেন) পূর্বপুরুষেরা কোনো কালে কেবল বাঙালি পরিচয়ে সাম্যবাদী ছিলেন। তাই মন্ত্র কিংবা ওয়াজ সুলভ সম্মোহন সৃষ্টি করে সাহিত্যে লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ হোক, এমনটা আমরা আমাদের সময়ের কবি-সাহিত্যিকদের কাছে আশা রাখতেই পারি; যে যার মতাদর্শ নিয়েই লিখুক, দিন শেষে সেটা যেন সাম্প্রদায়িকতার নামান্তর না হয়ে ওঠে, পাঠকের এই কামনা সম্ভবত অযৌক্তিক নয়। পক্ষ-বিপক্ষ থাক, তাতে সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ
'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দ...
-
কেবল ছোটগল্পের পাঠকই বোধকরি এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, একটি গল্পপাঠ শেষে আরও অনেকগুলো গল্পের বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠেন। গল্পকারও ...
-
মজার ব্যাপার হলো লাতিন আমেরিকায় যখন 'লো রেয়াল মারাভিঝোসে' [আশ্চার্য বাস্তব] রচনারীতি কিংবা মধ্য যুগের বারোকরীতি অবলম্বন করে লেখা হচ্...
-
ভুল বুঝবেন না! আসলে বলতে চেয়েছি, উত্তরাধুনিককালে মানুষের মাংস খাওয়ার ধরন কিংবা রূপান্তরটা কেমন হয়েছে। আদৌ কী মানুষ মানুষের মাংস খায়? গল্পগ্র...
-
'এই একঘেয়েমি বিরুদ্ধাচার কেন? সহনশীল হলে ক্ষতি কি হে দাপুটে আকাশ? একটু নিরপেক্ষ হতে শেখো'- আকাশকে মাটিতে নামিয়ে, সম্মুখে দাঁড় করি...