রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' একজন সাধারণ পাঠকের চোখে

লেখক মোজাফ্‌ফর হোসেন প্রণীত সদ্য পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত, 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' ইতিহাস, তত্ত্ব, সংকট ও সম্ভাবনা বইটির পাঠ শেষ করলাম। ইতোপূর্বে ডায়াসপোরা সাহিত্য সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনও ধারণা ছিলো না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে বইটি পড়ার পর আমি আমার ডায়াসপোরা সত্তাটিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছি এবং এতোদিন আমার ভেতরে যে অস্তিত্ব সংকট ছিলো তার একটা ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছি। আমার যখন বারো বছর বয়স তখন আরও কিছুটা উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সাথে ভারতে চলে যেতে হয়, কিন্তু এই যাওয়ায় আমার কোনও আগ্রহ ছিলো না। অথচ সেই বয়সে আমার মত প্রকাশ কিংবা মতের গুরুত্ব দেয়ার মতোও কেউ ছিলো না। অগ্যতা মেনে নিতে হয়েছে। বহু কেঁদেছি। একটুকরো শৈশবের স্মৃতি আঁকড়ে নতুন সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়েছি। এই মানিয়ে নিয়ে বাঁচা, নতুনভাবে পরিচয় বিনির্মাণ করা যে কতটা কঠিন সেটা বোধকরি ডায়াসপোরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব না, কিংবা বোঝানো!
এইসব নানাবিধ সংকট এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত সাহিত্যকেই বলে ডায়াসপোরা সাহিত্য, যেটা এই বইয়ে বিভিন্ন পর্বে ভাগ করে আলোচনা করেছেন লেখক মোজাফ্‌ফর হোসেন। তিনি ডায়াসপোরা শব্দটির ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং বর্তমানে এই শব্দটি ব্যবহারের প্রাসংগিকতা নিয়ে বলেছেন, 'ডায়াসপোরা শব্দটি গ্রিক। 'dia' মানে দূরে, 'speirein' অর্থ ছড়িয়ে পড়া।' ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ফসলের বীজ ছড়িয়ে পড়া হলেও শব্দটির অন্য ব্যবহার লক্ষ করা যায় খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ শতাব্দীর দিকে। ইসরাইল থেকে নির্বাসিত ইহুদিদের প্রথম ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঐ সময় আলেক্সান্দ্রিয়ার পণ্ডিতরা হিব্রু বাইবেল বা 'তোরাহ'র প্রথম পাঁচটি বই গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেন। এই অনুবাদে গৃহহীন ইহুদিদের জন্য ক্রিয়াপদ 'diaspeirein' এবং বিশেষ্যপদ 'diaspora'-এর ব্যবহার করা হয়।' আর এই ডায়াসপোরা শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ 'অভিবাসী' কিংবা 'প্রবাসী' নয় কেন, যার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, 'আমরা লক্ষ করবোঃ 'ডায়াসপোরা' এবং 'অভিবাসী' শব্দটি অর্থগতভাবে কাছাকাছি হলেও এদের মধ্যে ধারণাগত পার্থক্য আছে।'
এর পরেই লেখক উপনিবেশ পূর্ব ডায়াসপোরা ঔপনিবেশিক অথবা মধ্যযুগীয় ডায়াসপোরা উপনিবেশ-উত্তর বা আধুনিক ডায়াসপোরা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় গোটা বিশ্বের ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী ও ব্যক্তি, কেন, কীভাবে তারা ডায়াসপোরা? এটার খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। আমরা জানি বর্তমানে বহু মানুষ জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে নিজ 'জন্মভূমি' ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, জাতিসংঘের সুমারি অনুয়ায়ী এর সংখ্যা প্রায় ষাট কোটির ওপরে। বিভিন্ন দেশে থেকে এই মাতৃভূমিচ্যুত জনগোষ্ঠী বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় যে সাহিত্য রচনা করেন তার বিশ্লেষণ করতে আজ ডায়াসপোরা সাহিত্যতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ডায়াসপোরা তাত্ত্বিক সুদেশ মিশ্র এই ডায়াসপোরা তত্ত্বকে তাত্ত্বিকভাবে দুটো ভাগে বিভক্ত করেছেন যথা, সুগার ডায়াসপোরা এবং মসালা ডায়াসপোরা। কিন্তু ব্যাপারটা এহেন সরলরৈখিক কিছু নয়, একটু খোলসা করে বলিঃ আমার স্মৃতিতে কৈশোরপূর্ব বাংলাদেশ আছে কিন্তু আমার ছোট ভাই এবং বোন বাংলাদেশে জন্মেছে অথচ খুব ছোট থাকার কারণে বাংলাদেশ নিয়ে ওদের কোনও নস্টালজিক স্মৃতি নেই।
ফলত জন্মভূমি সম্পর্কে আমাদের ভাইবোনদের ভেতরেই রয়েছে বৈচিত্র্য। যেমন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ত্রিনিদাদবাসী নোবেনজয়ী লেখক ভি এস নাইপল। তাঁর জন্ম ত্রিনিদাদে কিন্তু পিতার ভারতে। আবার কেউ কেউ আছেন অভিবাসী কিংবা প্রবাসী, উন্নত জীবনের জন্য বিদেশে গিয়ে সেই দেশের নাগরিক হয়েছেন অথবা হননি। কেউ কেউ আছেন নির্বাসিত যেমন, তসলিমা নাসরিন, সালমান রুশদী প্রমুখ। এইসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন কোনও লেখক তাঁর দেখা কিংবা না দেখা 'মাতৃভূমি' নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন তখন যেমন নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয় তেমনই সংকট। যেটা হয়েছে সালমান রুশদীর ভারতের ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস 'মিডনাইট চিলড্রেন' নিয়ে; ভারতীয় পাঠক এক্ষেত্রে লেখকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন ইতিহাস বিকৃতির। যেমনটা হয়েছে বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক তহমিমা আনামের 'গার্মেন্টস' উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। ডায়াসপোরা সাহিত্যের নানান দিক, প্রশ্ন ও সম্ভাবনার খুঁটিনাটি নিয়ে রচিত হয়েছে মোজাফ্‌ফর হোসেন প্রণীত 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' বইটি। এমনকি তত্ত্ব পর্বে তিনি এই কথাটাও উল্লেখ করেছেন যে ডায়াসপোরা লেখকদের সকল লেখাই ডায়াসপোরা সাহিত্য নয়, কেননা ডায়াসপোরা সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেই সাহিত্যকে যেখানে ডায়াসপোরা জীবনের সংকটগুলো তুলনামূলকভাবে স্থান পেয়েছে। আর এমনটাও তো নয় যে সকল ডায়াসপোরা লেখক কেবল ডায়াসপোরা সংকট নিয়েই সাহিত্য রচনা করবেন!
এর পরেই লেখক এতোদিনের অনালোচিত বাংলাদেশি ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন, এই পর্বে লেখক প্রথমে দেশভাগোত্তর ডায়াসপোরা সাহিত্য, বাংলাদেশি বিহারী উর্দুভাষী ডায়াসপোরা এবং রোহিঙ্গা ডায়াসপোরা সম্পর্কে নানান অজানা সংকট ও সম্ভাবনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। দেশ ভাগের ফলে ভিটেচ্যুত হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ, ভারতে থেকে যেমন তৎকালীন পাকিস্তানে চলে গেছে বহু মুসলিম জনগোষ্ঠী তেমনই বহু হিন্দুরা চলে গেছেন ভারতে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ভেতরেই বহু মানুষ ডায়াসপোরা সংকটে ভুগছেন, এমনকি দুই বাংলায় এই নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে অনেক। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ডায়াসপোরা বলেই এই নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে কোনও উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়নি। তেমনই অনালোচিত রয়েছে বাংলাদেশি বিহারী ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী দ্বারা লিখিত উর্দু সাহিত্য। লেখকের ভাষায় বৃহত্তর ভারত ভাগ হয়ে যখন পাকিস্তান নামক আর একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয় তখন ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে এই উর্দুভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী অবিভক্ত পাকিস্তানে আসে। পরবর্তিতে পাকিস্তান ভাগ হয়ে যখন জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ, তখন এই জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে যেতে চাইলেও পাকিস্তান তাঁদের গ্রহণ করেনি। কিন্তু এই জনগোষ্ঠী মনেপ্রাণে রয়ে গেছে পাকিস্তানি, বাংলাদেশকে যেমন তাঁরা গ্রহণ করতে পারেননি তেমনই ভারতীয় হিসেবে পরিচয় দিতেও তাঁদের অনীহা।
ফলত এই বিহারী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী দ্বারা রচিত উর্দু সাহিত্য বাংলাদেশের মূলধারার সাহিত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু কীভাবে এই উর্দু সাহিত্য বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে, সেটা নিয়ে লেখকের মৌলিক আলোচনা প্রশংসনীয়। শুধু তাই নয়, বর্তমানে আরাকান থেকে নির্বাসিত বাংলাদেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের লিখিত সাহিত্য প্রাধান্য পেয়েছে এই বইয়ে। আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক যাঁরা বিদেশে থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করছেন তাঁদের সংকট ও সম্ভাবনার। উঠে এসেছে পাকিস্তানি ডায়াসপোরা সাহিত্য থেকে শুরু করে ভারতীয় বহু ডায়াসপোরা লেখকদের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁদের সাহিত্যকর্ম। সাক্ষাৎকার পর্বে ডায়াসপোরা লেখকদের সাথে আলোচনায় আলোচিত হয়েছে বহু ডায়াসপোরা অভিজ্ঞতার। ফলত এই পর্ব পাঠকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি আমি। সাথে লেখকের অনুবাদে পাঁচ ডায়াসপোরা লেখকের আড্ডা পাঠকদের ঝোলা সমৃদ্ধ করবে নিশ্চিত।
ছোট গল্পকার-অনুবাদক-প্রাবন্ধিক মোজাফ্‌ফর হোসেনের সরল এবং সাবলীল গদ্যশৈলী ইতোমধ্যে এপার-ওপারের বাঙালি পাঠক মহলে খুবই আলোচিত। একাডেমিক জটিলতা এড়িয়ে তিনি তত্ত্বের মতো ভারি বিষয়কে খুবই সরল এবং মনোগ্রাহী করে উপস্থাপন করেন যা পাঠক নন্দিত। 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' ও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এই বইটা পড়তে পড়তে আমার একটা অপেক্ষা ছিলো, শেষতক সেটা আর পূরণ হয়নি! ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হবে কিন্তু তসলিমা নাসরিনের মতো আলোচিত লেখক আসবেন না, এটা কি হয়! দুঃখের বিষয়, মাঝে মাঝে তিনি উঁকি দিয়েছেন বটে তবে আসেননি। কেন লেখক তসলিমাকে এড়িয়ে গেছেন সেটা নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই তসলিমা নাসরিনের লেখা 'ফেরা' উপন্যাসটি বাংলা ভাষায় লিখিত ডায়াসপোরা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নমুনা বলে মনে করি আমি। শৈলী ও বিনির্মাণগত দুর্বলতা থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে এতো এতো দুর্বল লেখকের মাঝে তসলিমা নাসরিন একেবারে অবহেলার নয়। যাইহোক ২০২০ এর অমর একুশে বইমেলায় অনুসন্ধিপ্সু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ কেবল নয়, বরং সব ধরনের পাঠকের মনের খোরাক যোগাবে, 'দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য' এতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
কবির মুকুল প্রদীপ
কবি-সমালোচক, নাট্যকর্মী ও ডান্স কোরিওগ্রাফার।
তারাগঞ্জ বাজার, নালিতাবাড়ি, শেরপুর।
ইমেইল-kobirmukul2222@gmail.com
ফোন নং ০১৯২৯৪৭৯৯৪৩

জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ

'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দ...