মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২০

একজন ওদা ও একটি লক্ষ্মীপেঁচা

আমাদের ঘরের পেছনদিকটায় বাঁশঝোপ, তার পেছনে এলোমেলো কিছুটা ফসলি জমি, পাগার, ডোবা। একটা সময় এই বাঁশঝোপে অনেক পাখি আসতো। সকালসন্ধ্যা কান ঝালাপালা করে দিতো ডেকে ডেকে। কিন্তু সে বেশ কবছর আগের কথা, যেবার আমার ছেলেটা হলো! ওর বয়স এখন তিন বছর এগার মাস, শুদ্ধ করে কথা বলতে শিখেছে। যেটা আমাদের কাছে বেশ গর্বের, কেননা আমরা যেখানে থাকি এখানে সকলেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, এমনকি আমিও। অথচ ছেলেটা যে কীভাবে শুদ্ধ বাংলা শিখল এটা খুবই আশ্চর্যের! দুঃখের বিষয় হচ্ছে এখন আর একটা পাখিও এই বাঁশঝোপে আসে না। সেই যেবার ছেলেটা হলো তখন থেকে! আজ এই মুহূর্তে সেই ছেলেটাকেই ওইসব পাখিদের কথা বলে বোঝানো আমার পক্ষে হয়ে পড়েছে চরম দুরূহ।

এইক্ষণে কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিতে চাই আপনাদের অনুমতি পেলে! এও বেশ আগের কথা, তখন আমরা পরিবারসহ বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে কেবল থিতু হতে চেষ্টা করছি। পাঁচ পেটের সংসারে রোজগেরে শুধু বাবা, লেগে থাকতো সর্বোক্ষণিক অনটন। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাই চাপ পড়লো আমার ওপরে। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আমি তখন একটি সাইকেলের সিট বানানোর কারখানায় কাজ নিয়েছি। সালটা ছিলো দুই হাজার। এটা মনে থাকার কারণ হচ্ছে তখন আমির খানের একটা ছবি বেরিয়েছিলো 'মেলা' নামের, এই ছবিতে একটা গান ছিলো, 'দেখো টু থাউজেন জামানা আগায়া' এরকম।

যাইহোক আসল কথা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে তখন চল্লিশোর্ধা এক সাদাসিধে নিসন্তান দম্পত্তি এসেছিলো এখানে। লোকটা হেলপারির কাজ নিয়েছিলো আমি যেখানে কাজ করি সেই কারখানায়। সকলকেই তিনি 'ওদা' বলে ডাকতেন, এভাবেই একপর্যায়ে তাকেও সকলে 'ওদা' বলে ডাকতে শুরু করে দিলে, শেষতক লোকটার নামই হয়ে গেলো 'ওদা'। এতে লোকটার কোনও আপত্তি ছিলো না, খুশি খুশি মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তাছাড়া এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে এলে মানিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। লোহালক্করের যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ হতো বলে বিশ্বকর্মা পুজোটা খুব ধুমধাম করে পালন করা হতো কারখানায়, মালিক পক্ষ এই দিনটাতে কর্মচারিদের ইচ্ছামতো মদ, মাংস খাওয়াতো।

মনে পড়ে সেবারেও খুব ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পুজা হয়েছিলো। হয়েছিলো মদ মাংসের এলাহি আয়োজন। এই একটা দিন খাইয়ে বছরভর কর্মচারিদের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন করে মালিক পক্ষ। কারখানায় আমরা যারা মদখোর ছিলাম সকলেই আগে থেকে লোড হয়ে থাকতাম, পরে যখন মূল খাওয়াদাওয়ার পর্ব চলত তখন আর তেমন খেতে পারতাম না। ওদা মদ চিনতো না, মদের মতো চিনতো না স্লাদও। তো হলো কি একজন মজা করে ওদার ভাতের থালায় স্লাদ দিয়ে দিয়েছিলো, আর ওদার সেকি রাগ! এই হাবাগোবা লোকটার ভেতরেরও যে এতো রাগ থাকতে পারে, সেটা বোধহয় দুর্বোধ্য ছিলো স্বয়ং বিশ্বকর্মারও! ওদা চিৎকার করে বলেছিলো, 'হুদাই খালি মোর লগে চ্যাঙ্রামি করে, মুই কি কাঁচা হোশা, কাঁচা টমেটু, কাঁচা পেঁয়াইজ খাই! মুই আর খামু না।' বাপরে বাপ কে তখন ওদাকে বোঝায় যে ওগুলো হচ্ছে স্লাদ, খেলে হজম ভালো হয়। আর কেইবা শোনে কার কথা! ওদার তখন একটাই বক্তব্য, 'মুই আর খামু না।'

আসলে সব কথা সবসময় সবাইকে বোঝানো সম্ভব নয়। যেমন আজ এই মুহূর্তে আমার ছেলেটিকে আমি বোঝাতে পারছি না ওই চলে যাওয়া পাখিদের কথা! তাছাড়া বাংলাদেশি মানুষ একটু অভিমানী বেশি হয়, কিন্তু বিদেশবিভূঁইয়ে ওইসব ঠুনকো অভিমানের কোনও দাম থাকে না, থাকতে নেই। এটা আমি বাংলাদেশি বলেই হয়তো তখন কিছুটা বুঝেছিলাম, ওদা বোঝেনি। পরে আস্তে আস্তে লোকটা হারিয়ে গেলো, কিন্তু কোথায় যে গেলো! হয়তো সেখানেই গেছে, যেখানে সরল মানুষেরা যায়! তবে আমার গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়, তাছাড়া এমনও না যে আমি ছেলেকে পাখিদের কথা বলি না। বছর দুয়েক আগে কবি বিনয় কর্মকার, শফিক সেলিম, সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ভাই এসেছিলেন আমাদের এখানে বেড়াতে, ছেলের জন্য বিনয়দা উপহার হিসেবে এনেছিলেন একটি দেশি-বিদেশি পাখির নাম ও বিবরণসহ বই।

ওই বইটা থেকে ছবি দেখে, আমার কাছে থেকে নাম শুনে ছেলে এখন অনেক বিদেশি পাখি চিনেছে। যথা নর্দান মকিংবার্ড, গোল্ডেন ফিজন্ট, দ্য হুপো, পাফিন, হামিংবার্ড, করডিনাল, কন্ডর। মাঝে মাঝে তোতা পাখির মতো আধো আধো সুরে এইসব বিদেশি পাখির নামগুলো আপন মনে উচ্চারণ করে। দূর থেকে শুনে আমার যে কি ভালোলাগে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল! মুগ্ধ হই, গর্বও হয়। পিতা হিসেবে মুহূর্তগুলো আমি চেটেপুটে উপোভোগ করি। দুঃখ হয় এই ভেবে, বাড়িতে আর কোনও পাখি আসে না, কেবল কতগুলো বুভুক্ষু দাঁড়কাক ছাড়া। কাককে আমার পাখি ভাবতে ইচ্ছে করে না, ওদের যা আচরণ! সুযোগ পেলেই বাচ্চা-বুড়োদের হাত থেকে ছোঁ মেরে খাবার কেড়ে নিয়ে উধাও হয়, একেবারে দেশের নীতিহীন মানুষগুলোর মতোন। হয়ত এই কেড়ে নেবার অভ্যাস ওরা মানুষের থেকেই শিখেছে! যদিও কথায় কথায় ওরা মানুষের মতো স্বগোত্রীয়দের মারে না, বোমা ফাটায় না, ধর্ম নিয়েও কোনও গর্ব নেই, বিধর্মীদের ঘৃণা করে না।

ইদানীং আমাকে আবার একটা বদভ্যাস পেয়ে বসেছে, ঘুম থেকে জেগেও বিছানা ছাড়ি না। লেপ মুড়ি দিয়ে চুপ করে থাকি। ছেলে আর তার মা খুব ভোরেই উঠে যায়, আমাকে ডেকে বিরক্ত করে না। তবে মোটু পাতলু দেখে দেখে ছেলে এখন ডক্টর ঝটকার মতো অনেক কিছু আবিষ্কার করে, এবং আবিষ্কৃত বস্তুটি আমাকে দেখাতে উদগ্রীব ছেলে ছুটে আসে ঘরে। বলে, 'দেখ বাবা কি আবিষ্কার করেছি।' তার চোখেমুখে বিস্ময়! সেই বিস্ময়কর বস্তুটি দেখে ওকে খুশি করতে আমিও বিস্ময়বোধক ভাব প্রকাশ করি। ছেলে খুশি হয় এবং বারবার তার নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আমাকে দেখাতে আসে, ফলে জেগে শুয়ে থাকার মজাটা আর তেমন উপভোগ করতে পারি না। বাবার কথা মনে পড়ে, এমন কতো অত্যাচার সহ্য না করতে হয়েছে তাকে! তবে পিতৃত্ব কিংবা মাতৃত্বের আলাদা স্বাদ আছে, যেটা না থাকলে মানুষ সন্তান প্রতিপালন করতো বলে মনে হয় না আমার!

আমি আসলে কোনও দক্ষ গল্প বলিয়ে নই, এক প্রসঙ্গ লিখতে নানান অযৌক্তিক কথা বলে বলে কেঁচিয়ে ফেলি, ফলত আর মূল প্রসঙ্গে ফিরতে পারি না। এই এখন যেমন পারছি না! তাই লেখাটা ফেসবুকে পোস্ট দিলে কেউ ছুঁয়েও দেখবে না, কেউ কেউ হয়ত লাইক দেবে কিন্তু পড়বে না। জানেন সেদিন কি হলো! সকালে আমি বিছানায় শুয়ে আছি ওমনি ছেলেটা এসে হঠাৎ ডাকতে শুরু করে দিলো। ভাবলাম কি আবার আবিষ্কার করেছে! কিন্তু না, বলছে, 'বাবা দেখে যাও জঙ্গলে কত্তবড় পাখি এসেছে।' এও আবার হয় নাকি! কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা, হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ঘরের পেছনদিকের বাঁশঝোপের কাছে। দেখি সত্যিই একটা বড় প্রজাতির লক্ষ্মীপেঁচা শুকনো বাঁশপাতার ভেতর পড়ে আছে, ওপরে কতোগুলো দাঁড়কাক! কাকগুলো যখনই পেঁচাটাকে আক্রমণ করতে চাইছে, শক্ত ঠোঁট হাঁ করে ফ্যাস্ ফ্যাস্ শব্দ করে পেঁচাটা অত্মরক্ষা করার চেষ্টা করছে।

আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে কাকগুলোকে তাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু ওরা গেলো না, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কা কা করে ডাকতে লাগলো। আমি পেঁচাটাকে ধরতে চাইলাম, ফ্যাস্ ফ্যাস্ করে সে আমাকেও ঠোঁকর দিতে চাইলো। কিন্তু আমি পেঁচাটাকে ধরে ফেললাম এবং বাড়িতে নিয়ে এসে দেখলাম, বাম পাশের ডানাটা ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, সেকারণেরই উড়তে পারছে না। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে আমি ওর ক্ষতস্থানে বাড়িতে থাকা লাল ওষুধ লাগিয়ে মুরগির খাঁচার ভেতর পুরে রাখলাম। কিন্তু বাঁধসাঁধলো ছেলেটা, একটা কঞ্চির লাঠি দিয়ে খোঁচাতে শুরু করলো পেঁচাটাকে। আমি ছেলেকে বোঝাতে চাইলাম এই বলে যে, 'বাবা ও ব্যথা পাচ্ছে, তুমি ওকে খুঁচিও না।' উলটে ছেলে ভীষণ কান্না জুড়ে দিলো, কান্না থামাতে ওকে খাবার কিনে দিতে চাইলাম কিন্তু মানলো না। হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায় আমি শেষতক দিনের কাজে বেরিয়ে পড়লাম।

দুপুরে বাড়ি ফিরলে বউ বল্লো, 'দেখ পেঁচাটার কি অবস্থা করেছে তোমার ছেলে।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন কি হয়েছে?' সে বলতে লাগলো, 'কি আর হবে! পায়ে দড়ি বেঁধে পেঁচাটাকে টেনে হিঁচড়ে একেবার যাচ্ছেতাই অবস্থা করেছে তোমার গুণোধর, গিয়ে দেখ।' আমি মুরগির খোঁয়াড়ের কাছে গিয়ে দেখি, ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ে আছে পেঁচাটা। আমার পায়ের শব্দ শুনে, শরীরটা একটু হালকা ঝাকুনি দিয়ে, খুব কষ্ট করে সে তার চোখ খুলে তাকালো। মনে হলো এই চোখ আমি আগেও দেখেছি, অসহায় এবং করুণ। কিন্তু কোথায় দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না; সিন্ধান্ত নিলাম ছেলে ঘুমালে রাতেই পেঁচাটাকে ছেড়ে দেবো, এই অবস্থায় ওকে দেখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।

বিকেলে আর কোনও কাজেই মনষ্ক হতে পারছিলাম না। পেঁচাটার করুণ চোখ আমার ভেতরে ছড়িয়ে দিয়েছিলো এক অদ্ভুত বিষণ্নতা, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম রাতের। তাই রাত দশটা নাগাত বাড়ি ফিরে সোজা খোঁয়াড়ের থেকে পেঁচাটাকে বের করে বাঁশঝোপের পেছনের মাঠে নিয়ে এলাম। মৃদু জোছনা এলিয়ে পড়েছে তখন মাঠে, সেই আলোয় পেঁচাটাকে এখন কিছুটা সতেজ দেখাচ্ছে। নিশাচর বলেই হয়ত এই সতেজতা, কারণ রাতেই ওরা স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বতঃস্ফূর্ত। আমি আর দেরি না করে এবার মাঠেই পেঁচাটাকে ছেড়ে দিলাম, মুহূর্তে ডানায় একটা ঝাড়া দিয়ে সে দেবদূতের মতো মানুষে রূপান্তরিত হয়ে আমার সামনে দাঁড়াল, কাঁধের একটু নিচে তার বড় বড় একজোড়া ডানা! আমি প্রথমে চমকে গেলাম কিন্তু পরোক্ষণেই লক্ষ করলাম ওমা, এতো আমাদের সেই ওদা! এতো বছর পর ওদাকে সামনে দেখে এতো প্রশ্ন এসে ভিড় করলো যে আমি তৎক্ষণাৎ কিছুই বলতে পারলাম না। কিন্তু ওদা আমার কোনও কথা শোনার অপেক্ষা না করে তার জখমি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়াল দিলো, প্রথমে উড়তে কিছুটা অসুবিধা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার সাবলীলতা খুঁজে পেল এবং মুহূর্তে গভীর অন্ধাকারে মিলিয়ে গেলো। হতভম্ব আমি অস্ফুট স্বরে কেবল উচ্চারণ করলাম, 'ওদা তুমি কোথায় থাক? সরল মানুষেরা কি তবে তোমার মতো লুপ্তপ্রায় লক্ষ্মীপেঁচা হয়ে যায়?

শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০

কবি দ্বীপ সরকারের কাব্য, 'ডারউইনের মুরিদ হবো' আত্মপ্রতিকৃতি

'এই একঘেয়েমি বিরুদ্ধাচার কেন? সহনশীল হলে ক্ষতি কি হে দাপুটে আকাশ?
একটু নিরপেক্ষ হতে শেখো'-

আকাশকে মাটিতে নামিয়ে, সম্মুখে দাঁড় করিয়ে কবিরাই বোধহয় এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন। উপদেশও দিতে পারেন, কেননা তিনি কবি, কোনও সাধারণ মানুষ নয়। এটা অবশ্যই মিথ্যে নয়। তবুও এভাবে কবিদের এলিয়েন বানিয়ে ফেলার প্রয়াস কিংবা মহৎ ভাবাটা রাজনৈতিক; পীড়াদায়কও বটে। তবে প্রকৃত কবি অবশ্যই একটি ভিন্ন সত্তা লালন করেন, সাধারণের মাঝে থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠার প্রয়াস পায় তাঁর জীবন ও কাব্যে। কবি দ্বীপ সরকারের কাব্য, 'ডারউইনের মুরিদ হবো' পাঠের পর আমারও তেমনটাই মনে হয়েছে। কারণ জীবনের ভেতর থেকে জীবনকেই বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে খুঁজে ফিরেছেন কবি, যার ভেতরে স্পষ্ট হয়েছে কবির বোধ, নির্মাণ দক্ষতা এবং আত্মপ্রতিকৃতি।

গুহাযুগ থেকে কৃষিনির্ভর ও আধুনিক জীবনে আসতে মানুষকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। যাপনপদ্ধতির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে চিন্তার জগত, ফলত কবিতার ভেতরেও এইসব বিবর্তন লক্ষ করা যায়। তাই বিজ্ঞজন ও বিদগ্ধ পাঠক মনে করেন ইতিহাসের বিশুদ্ধ নির্যাস কবিতার ভেতরেই দৃশ্যমান হয়। সময়ের কবিতায় পাঠক এমন বিশ্ববীক্ষা পছন্দ করেন। কিন্তু ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্ব আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় অন্য আর এক অভিজ্ঞতার সম্মুখে, প্রমাণ করে দেন মানুষ আসলে স্মৃতিকাতরতা নামক এক রোগে আক্রান্ত। কারণ মানুষ প্রকৃতি সাংঘর্ষিক, বহন করেন দীর্ঘ যাপনাভিজ্ঞতার প্রত্ন, ফলশ্রুত সভ্যতার আড়ালে মানুষকে ভোগ করতে হয় বহু শারীরীক প্রতিবন্ধকতা। কবিরাও এর ব্যতিক্রম নন, কবিরাও যাপন অভিজ্ঞতা, দর্শন, স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত হন, ফলে তাঁদের কবিতাকর্মটিও হয়ে পড়ে একরৈখিক। 'ডারউইনের মুরিদ হবো' কাব্যে কবি দ্বীপ সরকার এমন অভিজ্ঞতাকে সচেতনভাবে অতিক্রম করার প্রয়াস পেয়েছেন, আবার আক্রান্তও হয়েছেন।

এই কাব্যের ভূমিকায় কবি-প্রাবন্ধিক বীরেন মুখার্জী যথার্থই বলেছেন, বিষয় আশয়ের বাসনা থেকে বেরিয়ে যদি ধ্যানি হতে পারেন তবেই কবি দ্বীপ সরকারের মোক্ষ লাভের আশা আছে। তিনি এই কাব্যে ছন্দহীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই কাব্য নিয়ে কিছু লিখতে বসে আমার যখন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ভিন্নভাষার গোলাপজলে'র দ্বারস্ত হতে হয়েছে, তখনই মনে হয়েছে--প্রথম গ্রন্থ থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থে কবি পাঠকদের অন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করতে চেয়েছেন। ফলে কবিতা হয়ে উঠেছে নিরীক্ষাপ্রবন, যার চাপ এসে পড়েছে কবিতার শরীরে। ভাষা, ছন্দ এবং কাঠামোর ওপর। আমি কবিতায় নিরীক্ষার পক্ষে তবে শিল্পের শাশ্বত স্বতঃস্ফূর্ততাকে অক্ষুণ্ন রেখে। কবিদের এই একটাই তো অস্ত্র, 'শব্দবাণ।' কবি দ্বীপ সরকারকে এই 'শব্দবাণ' আরও শাণিত করতে হবে, কেননা তাঁর কবিতায় শব্দজট হয়ত নেই কিন্তু মেদবহুল; বিনির্মাণগত ত্রুটি আছে। নিম্নে আমি এই ধরনের কিছু স্তবক তুলে দিচ্ছি পাঠকের জ্ঞাতার্থে-

এক কুয়াশা সকালে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসলো 'চোখ মোড়ানো' বেজি
বিষাক্ত গোখরা লেজের ওপর দাঁড়ালো এবং
বেজির 'চোখ মুখে' প্রাজ্ঞের বিষ ছুড়ে দিলো-
[বেজি ও গোখরা]

এই বুদবুদের 'নিকটে' একদিন প্রশ্ন করেছিলাম
[বুদবুদ]

তবে 'উনুনে বসা' তহমিনা খাতুন উত্তর দিয়েছিলেন
[ঐ]

উজানে বাড়ি তার- সাঁতার শিখেছি যেতে
অক্টোপাস এসে ঘিরে ফেললো- রক্ত চুষে খেতে
যুদ্ধের ডানা উঁচিয়ে- একাত্তরের গল্প শুনোই
পাতাল থেকে মুক্তো কুড়ানোর অভিজ্ঞতা বুনোই
হেঁচকা দেই, খুলে যায় পাতাসমূহের বল্টু ও নাট
অক্টোপাস মরে গেলো- সাঁতরিয়ে পেরলাম ঘাট
[ডুমুর ডুমুর চোখ তার]

একদিন শিশিরের সাথে বাজখাই আকাশের বিরোধ আঁটে-
চাকচিক্য রৌদ্রের ফেনা ছিটাতে থাকলো
ভোরে শিশিরের মৌন মিছিল আগুনের ফায়ারিং চালালো
‘শিশিরের জিবের ভেতর গুজিয়ে দিলো টেরাকাঁটা মাছ’
অন্য ভাষার ছেদ চিহ্ন-
[শিশির আর ঘাসখেকো গাভী]

চোখ মোড়ানো বেজি 'শব্দবন্ধ' আমার সম্মুখে কোনও স্পষ্ট চিত্র কিংবা চিত্রকল্প নয়, কারণ এমন শব্দবন্ধ আমার অপরিচিত এবং দুর্বোধ্য কিংবা 'চোখ মুখে' না হয়ে হতে পারতো 'চোখেমুখে'। হয়ত এ আমার নিজেরই অক্ষমতা! তবে 'এই বুদবুদের নিকটে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম' কিংবা 'উনুনে বসা তহমিনা খাতুন' এর মতো পঙ্ক্তি অবশ্যই ভুল। কারণ 'তহমিনা খাতুন' উনুনে বসতে পারে না, পারে উনুনের পাশে বসতে। আর সামাসোক্তি অলংকারের মাধ্যমে বুদবুদের ওপর প্রাণসত্তা আরোপ করে প্রশ্ন করা যায় কিন্তু বুদবুদের 'নিকটে'(!) প্রশ্ন করা যায় না। তাছাড়া 'ডুমুর ডুমুর চোখ তার' কবিতা বা আরও কিছু কবিতার ছন্দ প্রয়াস কবির ছন্দ দুর্বলতার প্রমাণস্বরূপ, আর 'শিশিরের জিবের ভেতর গুজিয়ে দিলো টেরাকাঁটা মাছ' পঙ্ক্তিটি নির্দিষ্ট কোনও চিত্রকল্পের ইঙ্গিত বহন করে না।

এরকম সাধারণ কিছু চ্যুতি-বিচ্যুতি বাদ দিলে দ্বীপ সরকার একজন সম্ভাবনাময় কবি। তাঁর কবিতায় আছে এক নস্টালজিক ঘোর,
'ছায়াউরুর মাঝখানে মেঘের ছই আগলে ধরলে
আমি মুখ গুজিয়ে ওম চেখে নিচ্ছিলাম; মনে পড়ে।'

মূলত দ্বীপ সরকার কোনও উচ্চকণ্ঠ কবি নন, তার স্বর মৃদু গম্ভীর ও রোমান্টিক এবং অর্থময়। আছে উপদেশ আর ক্ষীণভাবে হলেও অধিবিদ্যা। 'মুখ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে পদ্য এবং পাখির কিচির মিচির' এই তো কবিতা! এমন পঙ্ক্তি যিনি রচনা করতে পারেন তিনিই তো কবি। তবে কবিতায় উপদেশ পামর স্বরূপ, ব্যক্তিগতভাবে আমার পাঠে বিঘ্ন ঘটায়। যদিও রুচিভেদে সেটা খণ্ডিত নয়, সুতরাং আসুন আরও কিছু সম্ভাবনাময় স্তবক পড়ি-

নদীতে পরিচিত হাওয়ারা টোকা দিচ্ছে
আর অদ্ভুত মাছগুলো অপহরণ করে চলেছে নদীর গল্প,
গোসল করতে নামা শিশুটির মাদুলিতে ঝুলছে বেড়ে ওঠা কৌশল
বালিকাদের মনে উপচে পড়ছে খণ্ডিত দৃশ্যের পুরাণ,
মূলত এগুলো আমার কবিতা নাও হতে পারে-
[খসরা এবং প্রস্তুতি বিষয়ক পাঠ]

স্মৃতিরোদে পুড়তে ভালোবাসে বলেই স্মৃতির কাছে ফিরে যায় মানুষ
আদিকাল থেকেই এই পোড়া বিষয়ক খুঁটিনাটি জানা;
বিষণ্নের ব্যাখ্যা থেকে একটু দূরে যেতে চাই
একটু ভিন্ন দিকে- তমাল জারুল চেরা মেঠোপথে
অথচ অবসন্ন আঁকড়ে ধরে আমাকে
পুনশ্চ ফিরে আসি-যেখানে স্মৃতির নোঙর ভিড়ানো,
[শুচিবাই]

ঐতিহ্যের বড়শিতে ঝুলে থাকা শতাব্দীর মাছ,
কার্নিশে নতজানু হয়ে বসে থাকা কুসুম করোটি
আমার প্রতিক্ষায় আছে- ওরা এভাবেই থাকে
[ঘর পলায়ন ইচ্ছেসমূহ]

আমার দাদি সন্ধ্যার আকাশ পানে তাকিয়ে বলতেন-
দেখ্ ঐ চাঁদের কুঁজো বুড়িটা নিরত শুঁটকির মতো ভেঁজে ওঠে
এলোকেশি চুল নাড়িয়ে দেয় চাঁদের মাচানে
[চন্দ্রপুরাণ]

সর্বোপরি কবি বীরেন মুখার্জীর মতো আমিও কবি দ্বীপ সরকারকে কবিতার কারিগর হিসেবে পেতে চাই, তবে তার জন্য পাঠককে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। 'ডারউনের মুরিদ হবো' কব্যে যার স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। আছে সমাজ-জীবন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দেশপ্রেম। তিনি অর্থময়, ইন্দ্রিয়জ অথবা অতিইন্দ্রিয়জ চিত্রকল্প নির্মাণে ঝোক থাকলেও তা এখনও সুনির্দিষ্ট নয়। আশাকরি এই কাব্যপাঠ সকল শ্রেণির পাঠককেই তৃপ্তি দিতে সক্ষম হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই কাব্যের বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করি। জয় হোক কবিতার।

কবির মুকুল প্রদীপ
কবি-সমালোচক, নাট্যকর্মী ও ডান্স কোরিওগ্রাফার।
তারাগঞ্জ বাজার, নালিতাবাড়ি, শেরপুর।
ইমেইল-kobirmukul2222@gmail.com
ফোন নং ০১৯২৯৪৭৯৯৪৩

জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ

'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দ...