সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

হাইপাররিয়েলিটি ও উত্তর-আধুনিক

বাস্তব বলে কিছু নেই। যাকিছু দৃশ্যমান তাকে বাস্তবের ছল বলেছেন বদ্রিয়ার। যেমন ধরুন উত্তর-আধুনিক কালের বিজ্ঞাপন, পণ্যের চেয়েও অধিকতর বাস্তব রূপে প্রদর্শিত হচ্ছে বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেক দার্শনিক। অথবা কোনও সেলিব্রিটি যে জীবনযাপন করেন, তিনি চাইলেও আর প্রকৃত বাস্তবতার সাথে কোনও সম্পর্ক রাখতে পারেন না তার বায়বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। কিংবা ওই সেলিব্রিটির কোন ভক্ত যখন কল্পনায় তার যাপনপদ্ধতি ফলো করেন, তাকে বলে কৃত্রিম বাস্তবতা অথবা হাইপাররিয়েলিটি। এই আরোপিত বাস্তবতা যে কেবল আধুনিকোত্তর কালে দৃশ্যমান হয়েছে এমন কিন্তু নয়, খ্রিস্টপূর্ব গ্রিক কবি ও কাব্যতাত্ত্বিক হোরেস তাঁর আর্স পোয়েটিকায় যে আলোচনা করেছিলেন, পরবর্তিতে নিও ক্লাসিসিজম যে সাহিত্যের ভিত্তিস্থাপন করেছিলো, ঠিক তেমনটা। কিংবা দান্তে যেভাবে খ্রিস্টানকে মহৎ প্রমাণ করেছেন তাঁর 'ইনফার্নো' কাব্যে তারই অনুরূপ। কিন্তু সময়ের চক্রব্যূহে এইসব মহত্ত্ব আজ আর টিকে নেই, তবে কব্যসুসমা ও ভাষাসম্মন্ধীয় কিছু কিছু তত্ত্ব আজও অনস্বীকার্য সেসকল তত্ত্ব ও সাহিত্যের।
হোরেস তাঁর এই পত্রকাব্যের শুরু করেছিলেন এক চিত্রকরের আঁকা একটি উদ্ভট চিত্রের বিশ্লেষণ দিয়ে এবং শেষ করেছিলেন ততোধিক কিদ্ভূত এক কবির জীবনাচারের ব্যাখ্যা দিয়ে। যে চিত্রশিল্পী আঁকতে বসে এঁকেছিলেন কিদ্ভূতদর্শন এক জানোয়ারের ছবি, যার চেহারাটা ঘোড়ার মতো হলেও মুখটা মানুষের এবং পেছনদিকে লেজের বদলে পাখির পালকের ন্যায় রংবেরঙের পালক। আর কবির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন এক ক্ষ্যাপাটে কবির কথা, যে কবি কাব্যসাধনার চেয়ে কবি কবি ভাব প্রকাশেই বেশি কৌতূহলি। সে কাব্যজনোচিত ব্যবহারবিধি জাহির করতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এবং চিৎকার করে কবিতা আওড়াতে আওড়াতে রাস্তা হাঁটে আর উড়ন্ত একটি কালো পাখিকে দেখে তার মাংস খাবে বলে তাড়া করতে করতে পড়ে যায় গাড্ডায়। ফলশ্রুত এই কবি যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কবিতা আওড়িয়েছে তখন একে দেখে তামাশা করেছে বাচ্চারাও আর গাড্ডায় পড়ে শত চিৎকার করেও সংবেদনা জাগাতে সক্ষম হলো না কোন সহনাগরিকের।
হোরেস তাঁর তত্ত্বে কাব্যে কতটুকু ছাড় দেয়া উচিত কবিদের সে বিষয় নিয়েও কিছু তাত্ত্বিক আলোচনা করেছিলেন, 'বলেছিলেন এটা পাঠককেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।' বোঝা যাচ্ছে কাব্যে কিরূপ শৃঙ্খলের কথা বলতে চেয়েছেন হোরেস, উদাহরণ স্বরূপ তিনি হোমারকে অনুকরণের কথা বলেছিলেন সমকালীন কবিদের। সুতরাং ধারণা করতে পারি গ্রিক মাইথলজির মহত্ত্ব বিনির্মাণকেই উৎকৃষ্ট কাব্যের আখ্যা দিতে চেয়েছিলেন হোরেস, পক্ষান্তরে একেই বলা যায় বায়বীয় বাস্তবতা; যা নেই ভবে তার অস্তিত্ব কল্পবাস্তবতায় অধিকতর বাস্তব অথবা মহৎ রূপে টিকে আছে বা থাকে। এই গল্প বানানোর ক্ষমতাই হোমো সেপিয়েন্সদের সভ্যতার পথ প্রসারিত করেছে বলে মনে করেন বহু নৃতাত্ত্বিক।
আর ইনফার্নো'য় দান্তে করেছেন নরকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, দেখিয়েছেন কীভাবে পাপের স্খালন করছেন তুলনামূলক খ্রিস্টীয় রীতিবিদ্বেষীরা। যেখানে সাঁজা ভোগ করতে দেখা যাচ্ছে সক্রেতিস, প্লেটো, এরিস্টটল, মোহাম্মদ (সা.)সহ খ্রিস্টীয় মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে যে সকল তাত্ত্বিক, দার্শনিক ভিন্ন মত তৈরি করতে চেয়েছেন। এরই একটা রূপ হচ্ছে পাশ্চাত্যের প্রাচ্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বলেছেন এডওয়ার্ড সাঈদ। ফলত প্রত্যেক ইউরোপীয় মনে করে প্রাচ্য হচ্ছে তন্ত্র-মন্ত্র-ঝাড়-ফুঁক-তাবিজ-কবজ তাই প্রাচ্যের মানুষের ওপর তাদের আধিপত্য ঈশ্বরপ্রদত্ত। সুতরাং জন্ম নেয় সাম্রাজ্যবাদী ধারণা, যা পরবর্তিতে সুপরিকল্পিতভাবে আরোপিত হয় প্রাচ্যের ওপর। যাকে বলে আধুনিক অথবা যন্ত্রসভ্যতা কিংবা সভ্যতা। এই আধুনিকতার নামে পাশ্চাত্য প্রাচ্যকে দখল করে, এবং চাপিয়ে দেয় তাঁদের মহৎ সংস্কৃতি(বায়বীয় খ্রস্টীয় রীতি) পক্ষান্তরে শোষণ ও লুণ্ঠন করে।
কিন্তু প্রাচ্যের মানুষের আছে লক্ষ লক্ষ বছরের যাপন অভিজ্ঞতা, চাইলেই তো আর তা রাতারাতি বদল করা সম্ভব না; তাছাড়া ইউরোপীয়দের মতে এইসব অলস ও কল্পনাবিলাসী মানুষ খুব সহজে বদলাতে চায় না, তাদের মন খোলা মাঠে পায়খানা করে যতটা তৃপ্ত হয়, মোজাইক করা বাথরুমে ততটা নয়। কিন্তু এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর প্রাচ্যতত্ত্ব গ্রন্থে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সহযোগে দেখিয়েছেন, কোন কালে প্রাচ্যের ক্ষমতা ছিলো পাশ্চাত্যকে শাসন করার। তিনি ইস্কাইলাসের নাটকের ভেতর থেকে খুঁজে বের করেছেন সেই সম্ভাবনা। তাছাড়া তিনি খ্রিস্টীয় জার্মানি সর্বেশ্বরবাদ থেকেও মুক্ত করেছেন উপমহাদেশের আধ্যাত্মবাদী সংস্কৃতিকে।
ওদিকে ফ্রয়েড, ইয়ুং, লাঁকা, ফুকো হয়ে জার্মানি চিন্তক নিৎশে ঘোষণা করেন, 'ঈশ্বরের মৃত্যু।' জর্জ বাতাই-এর মতো তাত্ত্বিক লিখলেন Story of the Eye নামে এমন একটি উপন্যাস যা খ্রিস্টীয় রীতিনীতির সকল সীমা লঙ্ঘন করে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিলো স্বয়ং ইউরোপীয়ানরা তাকে ব্যাখ্যা দিলো পর্নোগ্রাফি বলে। ধারণা করি উপমহাদেশের যৌনরাজনীতিকে অতিক্রম করে এই উপন্যাস পাঠযোগ্য হতে আরও কয়েক শ বছর লাগতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই মূলত তথাকথিত আধুনিকতার অবক্ষয়গুলো ইউরোপ জুড়ে দৃশ্যমান হতে থাকে। সত্তরের দশকে এসে মার্ক্সবাদ ও আধুনিকবাদকে সমালোচনা করার নামে পূর্ণতা পায় আর একটি নতুন মতবাদ পোস্টমডার্ন, যে কিনা মিডিয়াসর্বস্বতাকে ব্যবহারে সক্ষম, মানে হাইপাররিয়েলিটিকে ধরতে সক্ষম। পোস্টমডার্ন একদিকে আধুনিকতাকে অতিক্রম করতে চায় অন্যদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অনুসন্ধান করতে ফিরে যায় মধ্যযুগে। ফলশ্রুত গোটা ইউরোপ জুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ফান্টামেন্টালিজম। ভুলে গেলে চলবে না, উত্তর-আধুনিক শব্দটির অনেকগুলো অর্থের ভেতর একটা হচ্ছে ধর্মীয় পুনর্জীবন।
যে ফান্টামেন্টালিজম ভারতের শেকড়েও সূক্ষ্মভাবে প্রোথিত। গণতন্ত্রের নামে তাদের এতোদিনের যে ভাঁড়ামো, মিডিয়াসর্বস্বতায় এসে তা মৌলবাদে পর্যবতিস হয়। কেননা মিডিয়ার ভয়ংকর যে দিকটা আছে তা হচ্ছে প্ররোচনা, এরা তুচ্ছ কোন ঘটনাকেও এমনভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম যে; সাধারণ কোন ঘটানাই কুড়িয়ে নেয় নাগরিক সংবেদনা আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পড়ে যায় ধামাচাপা। মূলত এই মিডিয়ার বদৌলতে ভারত জাতিয়তাবাদের নামে যে চর্চা করেছে এক পর্যায়ে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মৌলবাদ। যা ইউরোপের পরবর্তী সংস্করণ বলা চলে। এমতবস্থায় বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের তো আর চুপ থাকা চলে না! কারণ বাঙালিদের অধিকার যে এতে খর্ব হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই তাঁরাও এতোদিনের আমদানিকৃত আধুনিকতার ওপর খড়্গহস্ত হলেন। কাঁচের ভেঙে যাওয়া আয়নার মতো যখন বিচূর্ণ হলো আধুনিকতা। কেবল তখনই বাঙালি সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা বুঝতে পারল বিচূর্ণ আয়নার খণ্ডিত অংশ থেকে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য উদ্ধারও হয়ে পড়েছে দুরূহ।
বাঙালি তাত্ত্বিকেরা এবার ভাবনায় পড়লেন! তাঁদের সম্মুখে তখন হাতছানি দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের পোস্টমডার্ন তত্ত্ব। ইতোমধ্য সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম পাশ্চাত্যের জারিজুরি কিছুটা স্পষ্ট করেছে। সুতরাং পোস্টমডার্ন গ্রহণ ও সাপের লেজে পা দেয়া সমান বুঝে হাংরি খ্যাত কবি মলয় রায় চৌধুরী ও তাঁর ভাই সমীর রায় চৌধুরী এবং সমসাময়িক আরও কিছু কবি-সাহিত্যিক মিলে ইউরোপীয় পোস্টমডার্নের বাঙালিকীকরণ করলেন উত্তর-আধুনিক নামে। সমস্তরকম আদর্শবাদ ভেঙে দেয়াই হচ্ছে এই তত্ত্বের মূল, যে আদর্শ গঠিত হয়েছে মহৎ কিছু বায়বীয় ধারণা থেকে যেমন আধুনিকতা, মার্ক্সবাদ, ধর্ম। কিন্তু এই তত্ত্ব যেহেতু অতীত অনুসন্ধানের দিকে ঝোঁকে তাই বাংলাদেশে এসে এই তত্ত্ব আর একটু বিকৃত হয়ে, হয়ে উঠলো মৌলবাদীদের হাতিয়ার। উত্তর-আধুনিকের নামে একশ্রেণি কবি-সাহিত্যিক ধর্মীয় আদর্শ উদ্ধারে লেগে গেলেন, ফলে প্রাণ পেল স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরে একটু গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই যে ধর্মপ্রাণ বাঙালি চোখে পড়ে, এরা বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত এই হাইপাররিয়েলিটির কবলে পড়ে। ধর্মীয় আধিপত্যবাদী যুক্তহীন যুক্তি ছাড়া তাদের সামনে কোন মানবিক আদর্শের ভিত্তি নেই। এইসব ধর্মঅন্তপ্রাণ সরল মানুষের ওপর খুব সহজেই আরোপ করা যায় লুটের সংস্কৃতি, ফান্টামেন্টালিজম। তো নতুন নতুন বলে উত্তর-আধুনিক-এর নামে হতাশ ও লোভী কিছু কবি-সাহিত্যিক-তাত্ত্বিকরাও শুরু করে দিলো লুটপাট আর দ্রুতই নাগালে এলো পদ-পদবী-অর্থ-কড়ি। এখন ঘটনা হচ্ছে, সাহিত্য ও কবিতার নামে আপনিও কি লুটপাট এবং পদ-পদবী হাতাবেন নাকি বিভ্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পথ দেখাবেন-- সেটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করেনি ও করে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জাদুবাস্তববাদ-এর বিভ্রান্তিসমূহ

'ফ্লোরেন্সের একজন নাবিক, আন্তোনিও পিপাফেত্তা, মাগেলানের প্রথম বিশ্বভ্রমণে তিনি ছিলেন তাঁর সহযোগী। আমাদের মধ্যরেখাসংলগ্ন আমেরিকা মহাদেশ দ...